ঢাকা    শনিবার, ১১ জুলাই ২০২৬
বাংলা গ্লোবাল বুলেটিন

স্থায়ী চাকরি ও নিশ্চিত আয়ের অভাবে বিয়ে ও সন্তান নেওয়ার পরিকল্পনা বিলম্বিত করছেন অনেক তরুণ-তরুণী।

বিয়ে ও সন্তান চান তরুণরা, বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে চাকরি ও অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা



বিয়ে ও সন্তান চান তরুণরা, বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে চাকরি ও অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা

বিশ্ব জনসংখ্যা দিবস উপলক্ষে প্রকাশিত জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিলের (ইউএনএফপিএ) নতুন এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, বাংলাদেশের অধিকাংশ তরুণ-তরুণী বিয়ে, পরিবার গঠন ও সন্তান নেওয়ার স্বপ্ন দেখেন। কিন্তু অনিশ্চিত চাকরি, আর্থিক অস্থিরতা এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ তাদের জীবনের গুরুত্বপূর্ণ এই সিদ্ধান্তগুলো পিছিয়ে দিতে বাধ্য করছে।

এবারের বিশ্ব জনসংখ্যা দিবসের প্রতিপাদ্য ‘তরুণদের আশা-আকাঙ্ক্ষার বাস্তবায়ন—আজ ও আগামীর জন্য’। এই প্রেক্ষাপটে ইউএনএফপিএ বলছে, জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণে দীর্ঘদিনের সাফল্যের পর বাংলাদেশ এখন নতুন এক বাস্তবতার মুখোমুখি। কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর এই সুবিধা পুরোপুরি কাজে লাগানোর সুযোগ ফুরিয়ে যাওয়ার আগেই তরুণদের জন্য পর্যাপ্ত কর্মসংস্থান, নিরাপত্তা ও সম্ভাবনা তৈরি করাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

ইউএনএফপিএর নতুন বৈশ্বিক প্রতিবেদন ‘লাইভস, চয়েসেস অ্যান্ড ফিউচারস’-এর জন্য বাংলাদেশসহ ৭৩টি দেশের ১৮ থেকে ৩৯ বছর বয়সী এক লাখ আট হাজারের বেশি মানুষের ওপর জরিপ চালানো হয়। এতে দেখা গেছে, তরুণদের মধ্যে পরিবার গঠনের আকাঙ্ক্ষা এখনও প্রবল।

জরিপে অংশ নেওয়া ৭৩ শতাংশ বলেছেন, জীবনে একজন সঙ্গী এবং সন্তান—দুটিই তাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ। এর মধ্যে ৪৫ শতাংশের কাছে বিষয়টি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। দুই-তৃতীয়াংশের বেশি উত্তরদাতা জানিয়েছেন, তাদের আদর্শ জীবনপথে বিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। অর্থাৎ, তরুণ প্রজন্ম ঐতিহ্যগত পারিবারিক জীবন থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে—এমন ধারণার সঙ্গে জরিপের ফল মেলে না।

তবে এই আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে বাস্তবতার বড় ফারাক রয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রায় ৯০ শতাংশ তরুণের কাছে আর্থিক নিরাপত্তা ও সুস্বাস্থ্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। বিশেষ করে স্থায়ী আয় ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা সম্পর্ক, বিয়ে এবং সন্তান নেওয়ার সিদ্ধান্তে বড় ভূমিকা রাখছে।

অনেকেই জানিয়েছেন, তারা পরিবার গড়তে চান, কিন্তু তার আগে প্রয়োজন স্থায়ী চাকরি, নিশ্চিত আয় এবং মানসিকভাবে প্রস্তুত হওয়ার সুযোগ।

বিশ্ব জনসংখ্যা দিবস উপলক্ষে ঢাকা ট্রিবিউনকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বাংলাদেশে ইউএনএফপিএর প্রতিনিধি ক্যাথরিন ব্রিন কামকং বলেন, ‘তরুণদের পরিবার বা সন্তান নেওয়ার গুরুত্ব বোঝাতে হয় না। তারা নিজেরাই পরিবারকে মূল্য দেন।’

জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ থেকে জনসংখ্যাগত সক্ষমতায়

দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের জনসংখ্যা নীতির মূল লক্ষ্য ছিল দ্রুত জনসংখ্যা বৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণ করা। কিন্তু এখন সেই অগ্রাধিকার বদলেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এখন সবচেয়ে বড় কাজ হলো জনসংখ্যাগত পরিবর্তনকে টেকসই উন্নয়নের শক্তিতে রূপ দেওয়া।

গত পাঁচ দশকে বাংলাদেশ এ ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। ১৯৭০-এর দশকে যেখানে একজন নারীর গড়ে প্রায় সাতটি সন্তান জন্ম হতো, বর্তমানে তা নেমে এসেছে প্রায় ২ দশমিক ৪-এ। একই সময়ে মানুষের গড় আয়ুও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।

এখনও দেশের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ মানুষ কর্মক্ষম বয়সে রয়েছে। ফলে বাংলাদেশ এখনও ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড বা জনসংখ্যাগত সুবিধার পর্যায়ে রয়েছে, যেখানে বড় কর্মক্ষম জনগোষ্ঠী অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে ত্বরান্বিত করতে পারে। তবে এই সুযোগ চিরস্থায়ী নয়।

কামকং বলেন, ‘বাংলাদেশ এখন এমন এক নতুন জনসংখ্যাগত পর্যায়ে প্রবেশ করছে, যেখানে জনসংখ্যা বৃদ্ধির চেয়ে বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে এই পরিবর্তনকে কীভাবে টেকসই উন্নয়নের ভিত্তিতে রূপ দেওয়া যায়।’

তার ভাষায়, ‘একদিকে কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর এই সুবিধা রয়েছে, অন্যদিকে ধীরে ধীরে প্রবীণ মানুষের সংখ্যাও বাড়ছে। তাই দুই বাস্তবতার জন্যই এখন থেকে প্রস্তুতি নিতে হবে।’

সামনে বার্ধক্যজনিত চ্যালেঞ্জ

বর্তমানে বাংলাদেশের জনসংখ্যার বড় অংশ তরুণ হলেও জন্মহার কমে যাওয়া এবং মানুষের গড় আয়ু বৃদ্ধির কারণে দেশ ধীরে ধীরে প্রবীণ জনগোষ্ঠীনির্ভর সমাজের দিকে এগোচ্ছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এখন নেওয়া নীতিগত সিদ্ধান্তই নির্ধারণ করবে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম শক্তিশালী স্বাস্থ্যব্যবস্থা, সামাজিক সুরক্ষা ও প্রবীণদের পরিচর্যার সুযোগ পাবে কি না।

ইউএনএফপিএ বলছে, বার্ধক্যজনিত এই বাস্তবতার জন্য প্রস্তুত হতে স্বাস্থ্যসেবা, সামাজিক সুরক্ষা, মানসম্মত কর্মসংস্থান এবং জীবনব্যাপী সহায়তা ব্যবস্থায় বিনিয়োগ বাড়াতে হবে।

সংস্থাটির মতে, সম্প্রতি গৃহীত জাতীয় জনসংখ্যা নীতি-২০২৫ এবং জাতীয় পরিবার পরিকল্পনা কৌশল (২০২৫-২০৩০) এই রূপান্তর মোকাবিলায় গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি তৈরি করেছে।

সবচেয়ে বড় পরীক্ষা কর্মসংস্থান

বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু কর্মক্ষম মানুষের সংখ্যা বেশি থাকলেই ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ডের সুফল পাওয়া যায় না। এর জন্য প্রয়োজন মানসম্মত শিক্ষা, দক্ষতা উন্নয়ন এবং উৎপাদনশীল কর্মসংস্থান।

বর্তমানে যুব বেকারত্ব, দক্ষতার সঙ্গে চাকরির অমিল এবং মানসম্মত কাজের স্বল্পতা বাংলাদেশের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ।

আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) তথ্য অনুযায়ী, দেশে যুব বেকারত্বের হার প্রায় ১৬ দশমিক ৮ শতাংশ। বিশেষ করে তরুণ নারীরা শ্রমবাজারে প্রবেশে বেশি বাধার মুখে পড়ছেন।

আইএলও আরও বলছে, বিপুলসংখ্যক তরুণ চাকরি, শিক্ষা কিংবা প্রশিক্ষণ—কোনোটির সঙ্গেই যুক্ত নন। আবার অনেকেই অনানুষ্ঠানিক, অস্থায়ী ও অনিরাপদ কাজে নিয়োজিত, যেখানে নেই চাকরির নিশ্চয়তা বা সামাজিক সুরক্ষা। ফলে ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা আরও বাড়ছে।

ইউএনএফপিএর মতে, এই অনিশ্চয়তাই তরুণদের সম্পর্ক, বিয়ে ও সন্তান নেওয়ার সিদ্ধান্তে ক্রমেই বড় প্রভাব ফেলছে।

কামকং বলেন, ‘মানসম্মত শিক্ষা, ভবিষ্যৎ উপযোগী ও ডিজিটাল দক্ষতা, ভালো কর্মসংস্থান, উদ্যোক্তা হওয়ার সুযোগ এবং সাশ্রয়ী সামাজিক সুরক্ষা—এসবই তরুণদের ভবিষ্যৎ নিয়ে আত্মবিশ্বাসী করে তুলতে পারে।’

তরুণীদের সমান সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে

বিশেষজ্ঞদের মতে, তরুণ নারীদের সমান সুযোগ নিশ্চিত না করলে বাংলাদেশের জনসংখ্যাগত রূপান্তরের সুফল পুরোপুরি পাওয়া সম্ভব হবে না।

মেয়েদের শিক্ষায় উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হলেও বাল্যবিয়ে, কিশোরী মাতৃত্ব, অবৈতনিক পরিচর্যার দায়িত্ব এবং কর্মসংস্থানে বৈষম্য এখনও তাদের সম্ভাবনাকে সীমিত করছে।

ইউএনএফপিএ বলছে, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও লিঙ্গসমতায় বিনিয়োগ বাড়ানো জরুরি, যাতে তরুণ-তরুণীরা শিক্ষা, কাজ, সম্পর্ক ও সন্তান নেওয়ার বিষয়ে সচেতন সিদ্ধান্ত নিতে পারেন।

এ ছাড়া মেয়েদের স্কুলে ধরে রাখা, বাল্যবিয়ে ও কিশোরী মাতৃত্ব প্রতিরোধ, শিক্ষা ও কর্মসংস্থানে সমান সুযোগ নিশ্চিত করা এবং পরিবারে পরিচর্যার দায়িত্ব ভাগাভাগির সংস্কৃতি গড়ে তোলাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

বিশেষজ্ঞদের মতে, জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণের যুগ পেরিয়ে বাংলাদেশ এখন নতুন এক বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে। আগামী দিনের সাফল্য আর শুধু জনসংখ্যার আকারের ওপর নির্ভর করবে না; বরং নির্ভর করবে দেশের কোটি তরুণ-তরুণী তাদের প্রত্যাশিত ভবিষ্যৎ গড়তে প্রয়োজনীয় শিক্ষা, দক্ষতা, কর্মসংস্থান, স্বাস্থ্যসেবা ও সমান সুযোগ পাচ্ছেন কি না, তার ওপর।

বিষয় : বিশ্ব জনসংখ্যা দিবস ইউএনএফপিএ জনসংখ্যা নীতি-২০২৫ আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা আইএলও

আপনার মতামত লিখুন

বাংলা গ্লোবাল বুলেটিন

শনিবার, ১১ জুলাই ২০২৬


বিয়ে ও সন্তান চান তরুণরা, বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে চাকরি ও অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা

প্রকাশের তারিখ : ১১ জুলাই ২০২৬

featured Image

বিশ্ব জনসংখ্যা দিবস উপলক্ষে প্রকাশিত জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিলের (ইউএনএফপিএ) নতুন এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, বাংলাদেশের অধিকাংশ তরুণ-তরুণী বিয়ে, পরিবার গঠন ও সন্তান নেওয়ার স্বপ্ন দেখেন। কিন্তু অনিশ্চিত চাকরি, আর্থিক অস্থিরতা এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ তাদের জীবনের গুরুত্বপূর্ণ এই সিদ্ধান্তগুলো পিছিয়ে দিতে বাধ্য করছে।

এবারের বিশ্ব জনসংখ্যা দিবসের প্রতিপাদ্য ‘তরুণদের আশা-আকাঙ্ক্ষার বাস্তবায়ন—আজ ও আগামীর জন্য’। এই প্রেক্ষাপটে ইউএনএফপিএ বলছে, জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণে দীর্ঘদিনের সাফল্যের পর বাংলাদেশ এখন নতুন এক বাস্তবতার মুখোমুখি। কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর এই সুবিধা পুরোপুরি কাজে লাগানোর সুযোগ ফুরিয়ে যাওয়ার আগেই তরুণদের জন্য পর্যাপ্ত কর্মসংস্থান, নিরাপত্তা ও সম্ভাবনা তৈরি করাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

ইউএনএফপিএর নতুন বৈশ্বিক প্রতিবেদন ‘লাইভস, চয়েসেস অ্যান্ড ফিউচারস’-এর জন্য বাংলাদেশসহ ৭৩টি দেশের ১৮ থেকে ৩৯ বছর বয়সী এক লাখ আট হাজারের বেশি মানুষের ওপর জরিপ চালানো হয়। এতে দেখা গেছে, তরুণদের মধ্যে পরিবার গঠনের আকাঙ্ক্ষা এখনও প্রবল।

জরিপে অংশ নেওয়া ৭৩ শতাংশ বলেছেন, জীবনে একজন সঙ্গী এবং সন্তান—দুটিই তাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ। এর মধ্যে ৪৫ শতাংশের কাছে বিষয়টি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। দুই-তৃতীয়াংশের বেশি উত্তরদাতা জানিয়েছেন, তাদের আদর্শ জীবনপথে বিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। অর্থাৎ, তরুণ প্রজন্ম ঐতিহ্যগত পারিবারিক জীবন থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে—এমন ধারণার সঙ্গে জরিপের ফল মেলে না।

তবে এই আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে বাস্তবতার বড় ফারাক রয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রায় ৯০ শতাংশ তরুণের কাছে আর্থিক নিরাপত্তা ও সুস্বাস্থ্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। বিশেষ করে স্থায়ী আয় ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা সম্পর্ক, বিয়ে এবং সন্তান নেওয়ার সিদ্ধান্তে বড় ভূমিকা রাখছে।

অনেকেই জানিয়েছেন, তারা পরিবার গড়তে চান, কিন্তু তার আগে প্রয়োজন স্থায়ী চাকরি, নিশ্চিত আয় এবং মানসিকভাবে প্রস্তুত হওয়ার সুযোগ।

বিশ্ব জনসংখ্যা দিবস উপলক্ষে ঢাকা ট্রিবিউনকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বাংলাদেশে ইউএনএফপিএর প্রতিনিধি ক্যাথরিন ব্রিন কামকং বলেন, ‘তরুণদের পরিবার বা সন্তান নেওয়ার গুরুত্ব বোঝাতে হয় না। তারা নিজেরাই পরিবারকে মূল্য দেন।’

জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ থেকে জনসংখ্যাগত সক্ষমতায়

দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের জনসংখ্যা নীতির মূল লক্ষ্য ছিল দ্রুত জনসংখ্যা বৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণ করা। কিন্তু এখন সেই অগ্রাধিকার বদলেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এখন সবচেয়ে বড় কাজ হলো জনসংখ্যাগত পরিবর্তনকে টেকসই উন্নয়নের শক্তিতে রূপ দেওয়া।

গত পাঁচ দশকে বাংলাদেশ এ ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। ১৯৭০-এর দশকে যেখানে একজন নারীর গড়ে প্রায় সাতটি সন্তান জন্ম হতো, বর্তমানে তা নেমে এসেছে প্রায় ২ দশমিক ৪-এ। একই সময়ে মানুষের গড় আয়ুও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।

এখনও দেশের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ মানুষ কর্মক্ষম বয়সে রয়েছে। ফলে বাংলাদেশ এখনও ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড বা জনসংখ্যাগত সুবিধার পর্যায়ে রয়েছে, যেখানে বড় কর্মক্ষম জনগোষ্ঠী অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে ত্বরান্বিত করতে পারে। তবে এই সুযোগ চিরস্থায়ী নয়।

কামকং বলেন, ‘বাংলাদেশ এখন এমন এক নতুন জনসংখ্যাগত পর্যায়ে প্রবেশ করছে, যেখানে জনসংখ্যা বৃদ্ধির চেয়ে বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে এই পরিবর্তনকে কীভাবে টেকসই উন্নয়নের ভিত্তিতে রূপ দেওয়া যায়।’

তার ভাষায়, ‘একদিকে কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর এই সুবিধা রয়েছে, অন্যদিকে ধীরে ধীরে প্রবীণ মানুষের সংখ্যাও বাড়ছে। তাই দুই বাস্তবতার জন্যই এখন থেকে প্রস্তুতি নিতে হবে।’

সামনে বার্ধক্যজনিত চ্যালেঞ্জ

বর্তমানে বাংলাদেশের জনসংখ্যার বড় অংশ তরুণ হলেও জন্মহার কমে যাওয়া এবং মানুষের গড় আয়ু বৃদ্ধির কারণে দেশ ধীরে ধীরে প্রবীণ জনগোষ্ঠীনির্ভর সমাজের দিকে এগোচ্ছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এখন নেওয়া নীতিগত সিদ্ধান্তই নির্ধারণ করবে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম শক্তিশালী স্বাস্থ্যব্যবস্থা, সামাজিক সুরক্ষা ও প্রবীণদের পরিচর্যার সুযোগ পাবে কি না।

ইউএনএফপিএ বলছে, বার্ধক্যজনিত এই বাস্তবতার জন্য প্রস্তুত হতে স্বাস্থ্যসেবা, সামাজিক সুরক্ষা, মানসম্মত কর্মসংস্থান এবং জীবনব্যাপী সহায়তা ব্যবস্থায় বিনিয়োগ বাড়াতে হবে।

সংস্থাটির মতে, সম্প্রতি গৃহীত জাতীয় জনসংখ্যা নীতি-২০২৫ এবং জাতীয় পরিবার পরিকল্পনা কৌশল (২০২৫-২০৩০) এই রূপান্তর মোকাবিলায় গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি তৈরি করেছে।

সবচেয়ে বড় পরীক্ষা কর্মসংস্থান

বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু কর্মক্ষম মানুষের সংখ্যা বেশি থাকলেই ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ডের সুফল পাওয়া যায় না। এর জন্য প্রয়োজন মানসম্মত শিক্ষা, দক্ষতা উন্নয়ন এবং উৎপাদনশীল কর্মসংস্থান।

বর্তমানে যুব বেকারত্ব, দক্ষতার সঙ্গে চাকরির অমিল এবং মানসম্মত কাজের স্বল্পতা বাংলাদেশের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ।

আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) তথ্য অনুযায়ী, দেশে যুব বেকারত্বের হার প্রায় ১৬ দশমিক ৮ শতাংশ। বিশেষ করে তরুণ নারীরা শ্রমবাজারে প্রবেশে বেশি বাধার মুখে পড়ছেন।

আইএলও আরও বলছে, বিপুলসংখ্যক তরুণ চাকরি, শিক্ষা কিংবা প্রশিক্ষণ—কোনোটির সঙ্গেই যুক্ত নন। আবার অনেকেই অনানুষ্ঠানিক, অস্থায়ী ও অনিরাপদ কাজে নিয়োজিত, যেখানে নেই চাকরির নিশ্চয়তা বা সামাজিক সুরক্ষা। ফলে ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা আরও বাড়ছে।

ইউএনএফপিএর মতে, এই অনিশ্চয়তাই তরুণদের সম্পর্ক, বিয়ে ও সন্তান নেওয়ার সিদ্ধান্তে ক্রমেই বড় প্রভাব ফেলছে।

কামকং বলেন, ‘মানসম্মত শিক্ষা, ভবিষ্যৎ উপযোগী ও ডিজিটাল দক্ষতা, ভালো কর্মসংস্থান, উদ্যোক্তা হওয়ার সুযোগ এবং সাশ্রয়ী সামাজিক সুরক্ষা—এসবই তরুণদের ভবিষ্যৎ নিয়ে আত্মবিশ্বাসী করে তুলতে পারে।’

তরুণীদের সমান সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে

বিশেষজ্ঞদের মতে, তরুণ নারীদের সমান সুযোগ নিশ্চিত না করলে বাংলাদেশের জনসংখ্যাগত রূপান্তরের সুফল পুরোপুরি পাওয়া সম্ভব হবে না।

মেয়েদের শিক্ষায় উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হলেও বাল্যবিয়ে, কিশোরী মাতৃত্ব, অবৈতনিক পরিচর্যার দায়িত্ব এবং কর্মসংস্থানে বৈষম্য এখনও তাদের সম্ভাবনাকে সীমিত করছে।

ইউএনএফপিএ বলছে, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও লিঙ্গসমতায় বিনিয়োগ বাড়ানো জরুরি, যাতে তরুণ-তরুণীরা শিক্ষা, কাজ, সম্পর্ক ও সন্তান নেওয়ার বিষয়ে সচেতন সিদ্ধান্ত নিতে পারেন।

এ ছাড়া মেয়েদের স্কুলে ধরে রাখা, বাল্যবিয়ে ও কিশোরী মাতৃত্ব প্রতিরোধ, শিক্ষা ও কর্মসংস্থানে সমান সুযোগ নিশ্চিত করা এবং পরিবারে পরিচর্যার দায়িত্ব ভাগাভাগির সংস্কৃতি গড়ে তোলাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

বিশেষজ্ঞদের মতে, জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণের যুগ পেরিয়ে বাংলাদেশ এখন নতুন এক বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে। আগামী দিনের সাফল্য আর শুধু জনসংখ্যার আকারের ওপর নির্ভর করবে না; বরং নির্ভর করবে দেশের কোটি তরুণ-তরুণী তাদের প্রত্যাশিত ভবিষ্যৎ গড়তে প্রয়োজনীয় শিক্ষা, দক্ষতা, কর্মসংস্থান, স্বাস্থ্যসেবা ও সমান সুযোগ পাচ্ছেন কি না, তার ওপর।


বাংলা গ্লোবাল বুলেটিন

সম্পাদক ও প্রকাশক : এম. আর. আলম
নির্বাহী সম্পাদক : মোঃ মহসিন পারভেজ

কপিরাইট © ২০২৬ বাংলা গ্লোবাল বুলেটিন । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত