ঢাকা    সোমবার, ২২ জুন ২০২৬
বাংলা গ্লোবাল বুলেটিন

১৯ তলার অনুমোদন, বিক্রি ২৫ তলার ফ্ল্যাট

ডম-ইনোর প্রতারণার জালে সর্বস্বান্ত হাজারো ফ্ল্যাট ক্রেতা



ডম-ইনোর প্রতারণার জালে সর্বস্বান্ত হাজারো ফ্ল্যাট ক্রেতা

রাজধানী ঢাকায় আবাসন ব্যবসার নামে হাজার হাজার মানুষকে সর্বস্বান্ত করেছে ডম-ইনো প্রপার্টিজ লিমিটেড। চটকদার বিজ্ঞাপন দিয়ে জমির মালিক ও গ্রাহকদের আকৃষ্ট করে ফাঁদে ফেলে তাদের কাছ থেকে হাতিয়ে নিয়েছে কয়েক হাজার কোটি টাকা। গ্রাহকের কাছে ফ্ল্যাট হস্তান্তরে দীর্ঘসূত্রতা ছাড়াও রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) ভুয়া নকশায় ফ্ল্যাট নির্মাণের অভিযোগ রয়েছে তাদের বিরুদ্ধে।

রাজধানীর তোপখানা রোড, পল্টন, রাজারবাগ, মিরপুর, গুলশান, ধানমন্ডি, বারিধারা, উত্তরাসহ বিভিন্ন অভিজাত এলাকায় বহুতল ভবন নির্মাণ করে এমন প্রতারণা করে আসছে ডম-ইনো। ভবন নির্মাণ করতে গিয়ে কখনো জমির মালিক আবার কখন ফ্ল্যাট ক্রেতাদের পদে পদে বিপদে ফেলছে প্রতিষ্ঠানটি।

সরেজমিন খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, নয়াপল্টনে কয়েকটি বহুতল ভবনের নির্মাণকাজ শুরু করেছিল ডম-ইনো। ভবনের কাজ চলমান থাকাবস্থায় ফ্ল্যাট বরাদ্দের নামে বহু মানুষের কাছ থেকে আগেভাগে অর্থ নিয়েছে। ভবনটির ফ্ল্যাটের সংখ্যার চেয়ে বেশি ফ্ল্যাট বিক্রি করেছে তারা। প্রতারণার মাধ্যমে তারা যাতে আর কারও কাছে ফ্ল্যাট বিক্রি করতে না পারে, সেজন্য জমির মালিক হাইকোর্টে রিট আবেদন করেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে উচ্চ আদালত আদেশ দিয়েছেন, জমির মালিকদের ফ্ল্যাট বুঝিয়ে না দেওয়া পর্যন্ত ডম-ইনো ফ্ল্যাট বিক্রি ও হস্তান্তর করতে পারবে না।

এদিকে নয়াপল্টন ভবনের মালিকদের মতোই ভয়াবহ প্রতারণার ফাঁদে পড়েছেন মিরপুর-১০-এর সি-ব্লকের ২১ নম্বর রোডের ১০ নম্বর বাড়ির মালিক ও ফ্ল্যাট ক্রেতারা। ভবনটির নির্মাণকাজ একযুগ আগে শুরু হয়ে আজও শেষ করতে পারেনি ডম-ইনো। জমির মালিক বাধ্য হয়ে ভবনের দ্বিতীয়তলায় নিজ উদ্যোগে গ্লাস লাগিয়ে বাড়ির মালপত্র রেখে দিয়েছেন। দীর্ঘদিন কাজ না করায় সাততলা ভবন জরাজীর্ণ অবস্থায় পড়ে আছে।

প্রতিষ্ঠানটির আরেক জালিয়াতি ২০ শান্তিনগর ভবনের নির্মাণকাজে। ২০০৮ সালে নির্মাণকাজ শুরু করে ১৮ বছরেও শেষ করতে পারেনি। ফলে ডম-ইনোকে তাড়িয়ে ১৩৬ জন ফ্ল্যাট ক্রেতা নিজ উদ্যোগে নির্মাণকাজ শুরু করেছেন। রাজউকের নকশা অনুযায়ী ভবনের ১৯ তলার অনুমোদন থাকলেও ২৫ তলা করার জন্য পিলার মোটা করা শুরু করে ডম-ইনো। ১৯ তলার ওপরে অবৈধভাবে তারা ১৬টি ফ্ল্যাট বিক্রি করেছে। ১৯ তলার ওপরে যারা ফ্ল্যাট কিনেছেন, তারা এখন বেকায়দায় রয়েছেন।

জানা গেছে, ২০০৮ সালে ২০ শান্তিনগর ১৯ তলা ভবন নির্মাণের জন্য রাজউকের কাছে নকশা অনুমোদন নিয়েছিল ডম-ইনো। ১৯ তলা নির্মাণকাজ সম্পন্ন হওয়ার পর ভবনটি ২৫ তলা পর্যন্ত করতে পুরোনো পিলারের সঙ্গে নতুন করে বেজমেন্ট থেকে আরেকটি ছোট পিলার এনে একতলার ছাদ পর্যন্ত করেছে। সেইসঙ্গে রাজউকের ১৯ তলাবিশিষ্ট অনুমোদিত নকশা ও কাগজপত্র ঘষামাজা করে ২৫ তলা করা হয়েছে।

১৯ তলা থেকে ২৫ তলা ভবন করতে ডম-ইনোর ইঞ্জিনিয়ার ও জনবল পিলার মোটা করেছে। ভবনের ঝুঁকির বিষয় মাথায় রেখে বেঁকে বসেন ভবনের ১৩৬ জন ফ্ল্যাট ক্রেতা। দীর্ঘসূত্রতা ও জালিয়াতির কারণে ডম-ইনোর ঠিকাদার, ইঞ্জিনিয়ার এবং সিকিউরিটি গার্ডকে ভবন থেকে বের করে দিয়েছেন ফ্ল্যাট ক্রেতারা। এখন নিজ উদ্যোগে কাজ করেছেন তারা।

তবে, ভবনের নির্মাণকাজ করতে গিয়ে ক্রেতাদের বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে বিদ্যুৎ সংযোগ। কারণ প্লটটি ডম-ইনোর নামে থাকায় তাদের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে স্থায়ীভাবে বিদ্যুৎ সংযোগ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। ফ্ল্যাট মালিকরা বিদ্যুৎ সংযোগ পেতে ঢাকা পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিডেটের (ডিপিডিসি) কাছে আবেদন করলেও কোনো সুরাহা হয়নি। বিদ্যুৎ সংযোগের বিষয়ে ডিপিডিসির নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মুহিবুল্লাহর স্বাক্ষরিত চিঠিতে লেখা হয়েছে, ‘প্লটের কাগজপত্র যাচাই-বাছাই এবং ডম-ইনোর আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে স্থায়ীভাবে বন্ধকৃত মিটারে বিদ্যুৎ সংযোগ পুনঃস্থাপন অথবা নতুন সংযোগ দেওয়া যাবে না।’

বহুতল ভবন নির্মাণ করতে গিয়ে ডম-ইনো একই অবস্থা করেছিল তোপখানা রোডের ৬ ও ৭ নম্বর বাড়িতে। বাড়িটি নির্মাণে রাজউকের নকশায় প্রথমে ১৫ তলা অনুমোদন দিলেও ১৭ তলা পর্যন্ত নির্মাণ করে ডম-ইনো। এতে অতিরিক্ত ৯টি ফ্ল্যাট বেড়ে যায়। জমির মালিকে একটি ফ্ল্যাট দিয়ে বাকি আটটি বিক্রি করে দেয় তারা। এতেই জমির মালিক ও ডম-ইনোর ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) আব্দুস সালামের সঙ্গে বিরোধ বাধে। ওই বিরোধের ঘটনায় মামলা হলে ২০০৭ সালে কারাগারে যান আব্দুস সালাম। এরপরও আব্দুস সালামের প্রতারণা থেমে থাকেনি। ফলে ডম-ইনো এবং প্রতিষ্ঠানটির এমডির বিরুদ্ধে ১৫০টির বেশি প্রতারণা-সংক্রান্ত মামলা হয়। প্রতারণা, চেক জালিয়াতি ও অর্থ আত্মসাতের মামলাগুলো বিভিন্ন আদালতে বিচারাধীন।

ডম-ইনোর প্রতারণার কারণে বাধ্য হয়ে ২০ শান্তিনগর ভবনের ফ্ল্যাট মালিকরা ‘ডম-ইনো প্রমেসা ফ্ল্যাট ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন’ নামে সংগঠন গঠন করেন। ওই সংগঠনের পক্ষ থেকে রাজউকের কাছে ডম-ইনোর প্রতারণার বিষয়ে আবেদন করা হয়েছে। ওই আবেদনে বলা হয়, ডম-ইনো ভবনের উচ্চতা বাড়াতে রাজউকের অসাধু কর্মকর্তাদের সহযোগিতায় রাজউকের বিভিন্ন দপ্তর থেকে ২০ শান্তিনগর ভবনের নকশা পরিবর্তন করে ১৯ তলা ভবনকে ২৫ তলায় প্রতিস্থাপন করা হয়েছে। ফ্ল্যাট মালিকদের কাছে ১৯ তলার অনুমোদিত নকশার কাগজপত্র রয়েছে।

তবে রাজউক সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা বলছেন, রাজউকের সিল ও সই জালিয়াতির মাধ্যমে জমির ভুয়া নকশা তৈরির মতো ফৌজদারি অপরাধের অভিযোগ আছে ডোম-ইনোর বিরুদ্ধে। বনানীতে এ প্রক্রিয়ায় নির্মিত একটি ভবনের অভিযোগে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ডম-ইনোর ব্যবস্থাপনা পরিচালক আবদুস সালামের বিরুদ্ধে মামলা করে। একই পথ বেছে নেওয়া হয়েছে ২০ শান্তিনগর ভবনের ক্ষেত্রে। ভবনটির নকশায় ১৯ তলার অনুমোদন নেওয়া হয়, যা ওই ভবনের ক্রেতাদের দেখানোও হয়েছে। কিন্তু শেষ পর্যায়ে এসে ভুয়া নকশা তৈরি করে ২৫ তলা পর্যন্ত করতে যায় ডম-ইনো। ২৫ তলা পর্যন্ত ফ্ল্যাট বিক্রি সম্পন্ন করেছে। ডন-ইনোর প্রতারণা বুঝতে পেরে ১৯ তলা পর্যন্ত যারা ফ্ল্যাট কিনেছেন, তারা ভবন থেকে ডম-ইনোর ইঞ্জিনিয়ার ও জনবলকে বের করে দিয়েছেন।

বহুতল ভবন নির্মাণে তিন থেকে চার বছর সময় বিক্রেতাদের দিলেও বাস্তবে ১০ থেকে ১৫ বছরেও ফ্ল্যাট হস্তান্তর করতে পারছে না ডম-ইনো। চরম অব্যবস্থাপনা ও প্রতারণার কারণে অর্থ পরিশোধ করেও ফ্ল্যাট বুঝে দেয়নি ক্রেতাদের কাছে। সংশ্লিষ্টরা জানান, ডম-ইনোর এমডির কারণেই স্বনামধন্য প্রতিষ্ঠানটি ধ্বংস হয়েছে। তিনি ফ্ল্যাট বিক্রির পাশাপাশি ওই ফ্ল্যাট আবার ব্যাংকের কাছে মর্টগেজ রেখে ঋণ নিয়েছেন। এতে অনেক ফ্ল্যাট মালিক ভবনে উঠলেও নিজেদের নামে দলিল বুঝে পাননি। ফলে ফ্ল্যাটের মালিকানা হারাতে পারেন ক্রেতারা।

অথচ জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের রিয়েল এস্টেট উন্নয়ন ও ব্যবস্থাপনা আইন-২০১০ এবং বিধিমালা-২০১১-এর ষষ্ঠ অধ্যায়ে বলা হয়েছে, ‘যদি কোন ডেভেলপার কোন ভূমির মালিকের সহিত রিয়েল এস্টেট উন্নয়ন বিষয়ে চুক্তি সম্পাদন করিয়া বা ক্রেতা বরাবর রিয়েল এস্টেটের বরাদ্দপত্র সম্পাদন করিয়া তদনুযায়ী কোন কার্যক্রম গ্রহণ না করে বা আংশিক কার্যক্রম গ্রহণ করিয়া বিনাকারণে অবশিষ্ট কাজ অসম্পাদিত অবস্থায় ফেলিয়া রাখে এবং তজ্জন্য ভূমির মালিককে বা ক্ষেত্রমত, ক্রেতাকে কোনরূপ আর্থিক সুবিধা প্রদান না করে, তাহা হইলে উহা এই আইনের অধীন একটি প্রতারণামূলক অপরাধ বলিয়া গণ্য হইবে এবং উক্ত অপরাধের জন্য ডেভেলপার অনূর্ধ্ব ২ বছর কারাদণ্ড অথবা অনূর্ধ্ব ২০ লাখ টাকা অর্থদণ্ড অথবা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হইবে।’

কর্ণফুলী গ্রুপে চাকরি করেন জহিরুল হক। তিনি রাজধানীর ২০ শান্তিনগর ভবনে ডম-ইনোর কাছ থেকে ফ্ল্যাট কিনেছেন। ২০০৯ সালে ফ্ল্যাট বিক্রি শুরু করে ২০১৪ সালে হস্তান্তরের কথা ছিল। কিন্তু ১৬ বছরেও ফ্ল্যাট হস্তান্তর করতে পারেনি। এরই মধ্যে ফ্ল্যাট বাবদ অনেকেই শতভাগ অর্থ পরিশোধ করেছেন। আবার অনেকে চুক্তি অনুযায়ী ৯০ শতাংশ অর্থ পরিশোধ করেছেন। এভাবে ডম-ইনোর প্রায় ৮০টি প্রজেক্ট অর্ধ-নির্মিত ও জরাজীর্ণ অবস্থায় দীর্ঘ ১০ থেকে ১৫ বছর ধরে পড়ে আছে।

ডম-ইনোর কাছে ফ্ল্যাট ক্রয় করে প্রতারণার ফাঁদে পড়েছেন আজিজুর রহমান আলম। তিনি কালবেলাকে বলেন, ‘সস্তায় পেয়ে ২০ তলায় ডম-ইনোর কাছ থেকে দুটি ফ্ল্যাট কিনেছিলেন। পরে জানতে পারি ভবনই ১৯ তলার। দীর্ঘ ৯ বছরেও ফ্ল্যাট বুঝে পাইনি। এখন ২০ তলা পর্যন্ত নির্মাণ নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে।’

ডম-ইনোর লোভনীয় অফারের ফাঁদে পড়ে ২০ শান্তিনগর ভবনে দুটি ফ্ল্যাট ক্রয় করেছিলেন রূপা বেগম। তিনি কালবেলাকে বলছেন, ‘দুই বছর আগে ডম-ইনোর কাছে দুটি ফ্ল্যাটের জন্য টাকা দিয়েছি। তবে, ফ্ল্যাট কেনার আগে কাগজপত্র দেখায়নি কোম্পানি। তারা বলেছিল কাগজপত্র কোম্পানির প্রাইভেট বিষয়, দেখানো যাবে না। ডম-ইনো নামিদামি কোম্পানি সেজন্য বিশ্বাস করেছিলাম। বিশ্বাস করে ফাঁদে পড়েছি।’

রূপা বেগম আরও বলেন, ‘শান্তিনগর এলাকায় ফ্ল্যাটের যেমন দাম হওয়ার কথা ছিল, সেই তুলনায় ফ্ল্যাট দুটির দাম অনেক কম ছিল। কম দামের কারণেই ডম-ইনোর ফাঁদে পড়েছি। এই ফাঁদ থেকে বের হওয়ার জন্য ডম-ইনোর সঙ্গে কয়েকবার মিটিং করেছি, জিডি করেছি ও লিগ্যাল নোটিশ পাঠিয়েছি। এমনকি ফ্ল্যাটের জন্য যে টাকা পরিশোধ করেছি, সেখান থেকে কিছুটা টাকা লোকসান হলেও বাকি টাকা ফেরত দিতে প্রস্তাব দিয়েছি। কিন্তু কোনো সমাধান হয়নি।’

তিনি বলেন, ‘ফ্ল্যাট কেনার জন্য যার মাধ্যমে টাকা দিয়েছিলাম তার মোবাইল ফোন বন্ধ, কোনো যোগাযোগ নেই। আবার ডম-ইনোর বনানীর অফিসে যাওয়ার পর যার সঙ্গে কথা বলছি, পরের দিন দেখি তিনি অফিসে নেই। কোম্পানির নানা সমস্যার কারণে অনেকে আবার চাকরি ছেড়ে দিয়েছেন।’

ধানমন্ডির ১৪ নম্বর সড়কের ৮ নম্বর প্লটে ১১ দশমিক ১০ কাঠা জমির ওপর বহুতল আবাসিক ভবন নির্মাণের জন্য ২০১৫ সালের ৯ আগস্ট ভূমির মালিকদের কাছে পাওয়ার অব অ্যাটর্নি নিয়েছিলেন আবদুস সালাম। ভবনে দুটি ফ্ল্যাট কেনার জন্য ডা. আতাউর রহমান ২ কোটি ৭৯ লাখ টাকা পরিশোধ করেন। কিন্তু আবদুস সালাম গোপনে ওই ফ্ল্যাট আরেকজনের কাছে হস্তান্তরের জন্য গণপূর্ত বিভাগের কাছে অনুমতি চান। বিষয়টি বুঝতে পেরে আতাউর রহমান গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের সচিব বরাবর নামঞ্জুরের জন্য আবেদন করেন।

আবাসন ব্যবসার নামে প্রতারণার বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক এবং সমাজ ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক কালবেলাকে বলেন, আবাসন প্রতিষ্ঠান ডম-ইনো বিল্ডার্সের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) আবদুস সালামের বিরুদ্ধে ১৩৬টি প্রতারণার মামলা এক দিনে হয়নি। মামলাগুলো হতে সময় লেগেছে। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলেও রাষ্ট্রের টনক নড়েনি। রাষ্ট্রের উচিত ছিল ডম-ইনোর এমডির বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠার পর তদন্ত কমিটি গঠন করা। তদন্তে অপরাধ প্রমাণিত হলে তার বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণ করা। সেটি না করে অপরাধীকে সুযোগ দেওয়া হয়েছে। ফলে দিনে দিনে অপরাধ বেড়েছে ডম-ইনোর এমডির।

তৌহিদুল হক আরও বলেন, এখন অভিযুক্ত ব্যক্তির ও তার আত্মীয়স্বজনের নামে যত স্থাবর ও অস্থাবর সম্পত্তি রয়েছে, সব বিক্রি করে ভুক্তভোগীদের দেনা-পাওনা পরিশোধ করা উচিত। একটা দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নিলে অন্যরাও এ ধরনের অপরাধ থেকে দূরে থাকবেন। দেশের বাইরে অর্থ পাচার কিংবা অপরাধ করে কিছুদিন শাস্তি ভোগের পরে ভালো থাকা গেলে মানুষ সেই পথেই হাঁটবেন বারবার।

ডম-ইনোর কাছে ফ্ল্যাট কিনে প্রতারণায় পড়া কয়েকজন ফ্ল্যাট মালিক জানান, নির্মাণ সামগ্রীর দাম বাড়ার অজুহাতে পুরোনো চুক্তি লঙ্ঘন করে ক্রেতাদের সঙ্গে নতুন করে চুক্তির ফাঁদ এঁকেছেন ডম-ইনোর এমডি আব্দুস সালাম। ১০ থেকে ১৫ বছর আগে যারা ফ্ল্যাট কেনার জন্য ডম-ইনোর কাছে চুক্তি করেছিলেন, তাদের আগের নির্ধারিত দামের চেয়ে কয়েকগুণ বেশি দামে চুক্তি করার জন্য বলছেন তিনি।

জানা গেছে, ডম-ইনোর এমডি আবদুস সালাম কয়েক দফা কারাগারে গেলেও জামিনে বের হন। তিনি এখন নিয়মিত বনানীতে অফিস করছেন। তবে, ফ্ল্যাট কেনে যারা ভুক্তভোগী হয়েছেন, তাদের কাছ থেকে আড়ালে থাকছেন। অফিসে দায়িত্বরত সিকিউরিটি গার্ডদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে কোনো ক্রেতা যাতে অফিসে ঢুকতে না পারেন।

আবাসন ব্যবসায়ীদের সংগঠন বাংলাদেশ রিয়েল এস্টেট অ্যান্ড হাউজিং অ্যাসোসিয়েশন (রিহ্যাব) ২০০৪ থেকে ২০২৬ সালের এপ্রিল পর্যন্ত ‘রিহ্যাব মেডিয়েশন সেলে’ মোট ১ হাজার ২৩৪টি বিরোধ আপস-মীমাংসা করলেও ডম-ইনোর শত শত অভিযোগ ও প্রতারণার বিষয়গুলো সমাধান করতে পারেনি। ফলে রিহ্যাবের নির্বাচিত কমিটির সিদ্ধান্তে সংগঠনটির মেম্বারশিপ হারায় ডম-ইনো।

আবাসন ব্যবসায়ীদের সংগঠন রিহ্যাবের সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট আব্দুর রাজ্জাক কালবেলাকে বলেন, ‘ফ্ল্যাট বুকিং দেওয়ার আগে ক্রেতাদের উচিত ওই কোম্পানি রিহ্যাবের সদস্য কি না, সেটির খোঁজ নেওয়া। গ্রিনফিল্ড থাকা অবস্থায় কোনো কোম্পানির কাছে ফ্ল্যাট কেনা যাবে না। তবে, ভবন নির্মাণ চলমান থাকাবস্থায় ফ্ল্যাট কিনে নিয়মিত তদারকি করতে হবে।’

এসব নানা অভিযোগের বিষয়ে ডম-ইনোর অফিস নম্বরে ফোন করা হলে প্রতিবেদককে অফিসে যেতে বলেন। পরে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগের জন্য বনানীতে ডম-ইনোর অফিসে গেলেও কোনো জবাব মেলেনি। বেশ কয়েকজন কর্মকর্তা নানা বিষয় জানতে চাইলেও আনুষ্ঠানিক বক্তব্য দিতে রাজি হননি। তবে এক কর্মকর্তা বলেন, ফ্ল্যাট হস্তান্তরের দীর্ঘসূত্রতা নিয়ে কোম্পানির নামে মামলা করে কোনো সমাধান হবে না।

পরে গতকাল রোববার ডম-ইনোর এমডি আবদুস সালামের মোবাইলে ফোন করলে নম্বরটি বন্ধ পাওয়া যায়। তবে হোয়াটসঅ্যাপে খোলা ছিল। এটিতে কল করা হলেও তিনি ধরেননি। পরে হোয়াটসঅ্যাপে প্রশ্ন লিখে পাঠানো হয়, এরও কোনো জবাব দেননি তিনি।

বিষয় : রিহ্যাব রাজউক ডম-ইনো প্রপার্টিজ লিমিটেড ডিপিডিসি

আপনার মতামত লিখুন

বাংলা গ্লোবাল বুলেটিন

সোমবার, ২২ জুন ২০২৬


ডম-ইনোর প্রতারণার জালে সর্বস্বান্ত হাজারো ফ্ল্যাট ক্রেতা

প্রকাশের তারিখ : ২২ জুন ২০২৬

featured Image

রাজধানী ঢাকায় আবাসন ব্যবসার নামে হাজার হাজার মানুষকে সর্বস্বান্ত করেছে ডম-ইনো প্রপার্টিজ লিমিটেড। চটকদার বিজ্ঞাপন দিয়ে জমির মালিক ও গ্রাহকদের আকৃষ্ট করে ফাঁদে ফেলে তাদের কাছ থেকে হাতিয়ে নিয়েছে কয়েক হাজার কোটি টাকা। গ্রাহকের কাছে ফ্ল্যাট হস্তান্তরে দীর্ঘসূত্রতা ছাড়াও রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) ভুয়া নকশায় ফ্ল্যাট নির্মাণের অভিযোগ রয়েছে তাদের বিরুদ্ধে।

রাজধানীর তোপখানা রোড, পল্টন, রাজারবাগ, মিরপুর, গুলশান, ধানমন্ডি, বারিধারা, উত্তরাসহ বিভিন্ন অভিজাত এলাকায় বহুতল ভবন নির্মাণ করে এমন প্রতারণা করে আসছে ডম-ইনো। ভবন নির্মাণ করতে গিয়ে কখনো জমির মালিক আবার কখন ফ্ল্যাট ক্রেতাদের পদে পদে বিপদে ফেলছে প্রতিষ্ঠানটি।

সরেজমিন খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, নয়াপল্টনে কয়েকটি বহুতল ভবনের নির্মাণকাজ শুরু করেছিল ডম-ইনো। ভবনের কাজ চলমান থাকাবস্থায় ফ্ল্যাট বরাদ্দের নামে বহু মানুষের কাছ থেকে আগেভাগে অর্থ নিয়েছে। ভবনটির ফ্ল্যাটের সংখ্যার চেয়ে বেশি ফ্ল্যাট বিক্রি করেছে তারা। প্রতারণার মাধ্যমে তারা যাতে আর কারও কাছে ফ্ল্যাট বিক্রি করতে না পারে, সেজন্য জমির মালিক হাইকোর্টে রিট আবেদন করেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে উচ্চ আদালত আদেশ দিয়েছেন, জমির মালিকদের ফ্ল্যাট বুঝিয়ে না দেওয়া পর্যন্ত ডম-ইনো ফ্ল্যাট বিক্রি ও হস্তান্তর করতে পারবে না।

এদিকে নয়াপল্টন ভবনের মালিকদের মতোই ভয়াবহ প্রতারণার ফাঁদে পড়েছেন মিরপুর-১০-এর সি-ব্লকের ২১ নম্বর রোডের ১০ নম্বর বাড়ির মালিক ও ফ্ল্যাট ক্রেতারা। ভবনটির নির্মাণকাজ একযুগ আগে শুরু হয়ে আজও শেষ করতে পারেনি ডম-ইনো। জমির মালিক বাধ্য হয়ে ভবনের দ্বিতীয়তলায় নিজ উদ্যোগে গ্লাস লাগিয়ে বাড়ির মালপত্র রেখে দিয়েছেন। দীর্ঘদিন কাজ না করায় সাততলা ভবন জরাজীর্ণ অবস্থায় পড়ে আছে।

প্রতিষ্ঠানটির আরেক জালিয়াতি ২০ শান্তিনগর ভবনের নির্মাণকাজে। ২০০৮ সালে নির্মাণকাজ শুরু করে ১৮ বছরেও শেষ করতে পারেনি। ফলে ডম-ইনোকে তাড়িয়ে ১৩৬ জন ফ্ল্যাট ক্রেতা নিজ উদ্যোগে নির্মাণকাজ শুরু করেছেন। রাজউকের নকশা অনুযায়ী ভবনের ১৯ তলার অনুমোদন থাকলেও ২৫ তলা করার জন্য পিলার মোটা করা শুরু করে ডম-ইনো। ১৯ তলার ওপরে অবৈধভাবে তারা ১৬টি ফ্ল্যাট বিক্রি করেছে। ১৯ তলার ওপরে যারা ফ্ল্যাট কিনেছেন, তারা এখন বেকায়দায় রয়েছেন।

জানা গেছে, ২০০৮ সালে ২০ শান্তিনগর ১৯ তলা ভবন নির্মাণের জন্য রাজউকের কাছে নকশা অনুমোদন নিয়েছিল ডম-ইনো। ১৯ তলা নির্মাণকাজ সম্পন্ন হওয়ার পর ভবনটি ২৫ তলা পর্যন্ত করতে পুরোনো পিলারের সঙ্গে নতুন করে বেজমেন্ট থেকে আরেকটি ছোট পিলার এনে একতলার ছাদ পর্যন্ত করেছে। সেইসঙ্গে রাজউকের ১৯ তলাবিশিষ্ট অনুমোদিত নকশা ও কাগজপত্র ঘষামাজা করে ২৫ তলা করা হয়েছে।

১৯ তলা থেকে ২৫ তলা ভবন করতে ডম-ইনোর ইঞ্জিনিয়ার ও জনবল পিলার মোটা করেছে। ভবনের ঝুঁকির বিষয় মাথায় রেখে বেঁকে বসেন ভবনের ১৩৬ জন ফ্ল্যাট ক্রেতা। দীর্ঘসূত্রতা ও জালিয়াতির কারণে ডম-ইনোর ঠিকাদার, ইঞ্জিনিয়ার এবং সিকিউরিটি গার্ডকে ভবন থেকে বের করে দিয়েছেন ফ্ল্যাট ক্রেতারা। এখন নিজ উদ্যোগে কাজ করেছেন তারা।

তবে, ভবনের নির্মাণকাজ করতে গিয়ে ক্রেতাদের বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে বিদ্যুৎ সংযোগ। কারণ প্লটটি ডম-ইনোর নামে থাকায় তাদের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে স্থায়ীভাবে বিদ্যুৎ সংযোগ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। ফ্ল্যাট মালিকরা বিদ্যুৎ সংযোগ পেতে ঢাকা পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিডেটের (ডিপিডিসি) কাছে আবেদন করলেও কোনো সুরাহা হয়নি। বিদ্যুৎ সংযোগের বিষয়ে ডিপিডিসির নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মুহিবুল্লাহর স্বাক্ষরিত চিঠিতে লেখা হয়েছে, ‘প্লটের কাগজপত্র যাচাই-বাছাই এবং ডম-ইনোর আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে স্থায়ীভাবে বন্ধকৃত মিটারে বিদ্যুৎ সংযোগ পুনঃস্থাপন অথবা নতুন সংযোগ দেওয়া যাবে না।’

বহুতল ভবন নির্মাণ করতে গিয়ে ডম-ইনো একই অবস্থা করেছিল তোপখানা রোডের ৬ ও ৭ নম্বর বাড়িতে। বাড়িটি নির্মাণে রাজউকের নকশায় প্রথমে ১৫ তলা অনুমোদন দিলেও ১৭ তলা পর্যন্ত নির্মাণ করে ডম-ইনো। এতে অতিরিক্ত ৯টি ফ্ল্যাট বেড়ে যায়। জমির মালিকে একটি ফ্ল্যাট দিয়ে বাকি আটটি বিক্রি করে দেয় তারা। এতেই জমির মালিক ও ডম-ইনোর ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) আব্দুস সালামের সঙ্গে বিরোধ বাধে। ওই বিরোধের ঘটনায় মামলা হলে ২০০৭ সালে কারাগারে যান আব্দুস সালাম। এরপরও আব্দুস সালামের প্রতারণা থেমে থাকেনি। ফলে ডম-ইনো এবং প্রতিষ্ঠানটির এমডির বিরুদ্ধে ১৫০টির বেশি প্রতারণা-সংক্রান্ত মামলা হয়। প্রতারণা, চেক জালিয়াতি ও অর্থ আত্মসাতের মামলাগুলো বিভিন্ন আদালতে বিচারাধীন।

ডম-ইনোর প্রতারণার কারণে বাধ্য হয়ে ২০ শান্তিনগর ভবনের ফ্ল্যাট মালিকরা ‘ডম-ইনো প্রমেসা ফ্ল্যাট ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন’ নামে সংগঠন গঠন করেন। ওই সংগঠনের পক্ষ থেকে রাজউকের কাছে ডম-ইনোর প্রতারণার বিষয়ে আবেদন করা হয়েছে। ওই আবেদনে বলা হয়, ডম-ইনো ভবনের উচ্চতা বাড়াতে রাজউকের অসাধু কর্মকর্তাদের সহযোগিতায় রাজউকের বিভিন্ন দপ্তর থেকে ২০ শান্তিনগর ভবনের নকশা পরিবর্তন করে ১৯ তলা ভবনকে ২৫ তলায় প্রতিস্থাপন করা হয়েছে। ফ্ল্যাট মালিকদের কাছে ১৯ তলার অনুমোদিত নকশার কাগজপত্র রয়েছে।

তবে রাজউক সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা বলছেন, রাজউকের সিল ও সই জালিয়াতির মাধ্যমে জমির ভুয়া নকশা তৈরির মতো ফৌজদারি অপরাধের অভিযোগ আছে ডোম-ইনোর বিরুদ্ধে। বনানীতে এ প্রক্রিয়ায় নির্মিত একটি ভবনের অভিযোগে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ডম-ইনোর ব্যবস্থাপনা পরিচালক আবদুস সালামের বিরুদ্ধে মামলা করে। একই পথ বেছে নেওয়া হয়েছে ২০ শান্তিনগর ভবনের ক্ষেত্রে। ভবনটির নকশায় ১৯ তলার অনুমোদন নেওয়া হয়, যা ওই ভবনের ক্রেতাদের দেখানোও হয়েছে। কিন্তু শেষ পর্যায়ে এসে ভুয়া নকশা তৈরি করে ২৫ তলা পর্যন্ত করতে যায় ডম-ইনো। ২৫ তলা পর্যন্ত ফ্ল্যাট বিক্রি সম্পন্ন করেছে। ডন-ইনোর প্রতারণা বুঝতে পেরে ১৯ তলা পর্যন্ত যারা ফ্ল্যাট কিনেছেন, তারা ভবন থেকে ডম-ইনোর ইঞ্জিনিয়ার ও জনবলকে বের করে দিয়েছেন।

বহুতল ভবন নির্মাণে তিন থেকে চার বছর সময় বিক্রেতাদের দিলেও বাস্তবে ১০ থেকে ১৫ বছরেও ফ্ল্যাট হস্তান্তর করতে পারছে না ডম-ইনো। চরম অব্যবস্থাপনা ও প্রতারণার কারণে অর্থ পরিশোধ করেও ফ্ল্যাট বুঝে দেয়নি ক্রেতাদের কাছে। সংশ্লিষ্টরা জানান, ডম-ইনোর এমডির কারণেই স্বনামধন্য প্রতিষ্ঠানটি ধ্বংস হয়েছে। তিনি ফ্ল্যাট বিক্রির পাশাপাশি ওই ফ্ল্যাট আবার ব্যাংকের কাছে মর্টগেজ রেখে ঋণ নিয়েছেন। এতে অনেক ফ্ল্যাট মালিক ভবনে উঠলেও নিজেদের নামে দলিল বুঝে পাননি। ফলে ফ্ল্যাটের মালিকানা হারাতে পারেন ক্রেতারা।

অথচ জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের রিয়েল এস্টেট উন্নয়ন ও ব্যবস্থাপনা আইন-২০১০ এবং বিধিমালা-২০১১-এর ষষ্ঠ অধ্যায়ে বলা হয়েছে, ‘যদি কোন ডেভেলপার কোন ভূমির মালিকের সহিত রিয়েল এস্টেট উন্নয়ন বিষয়ে চুক্তি সম্পাদন করিয়া বা ক্রেতা বরাবর রিয়েল এস্টেটের বরাদ্দপত্র সম্পাদন করিয়া তদনুযায়ী কোন কার্যক্রম গ্রহণ না করে বা আংশিক কার্যক্রম গ্রহণ করিয়া বিনাকারণে অবশিষ্ট কাজ অসম্পাদিত অবস্থায় ফেলিয়া রাখে এবং তজ্জন্য ভূমির মালিককে বা ক্ষেত্রমত, ক্রেতাকে কোনরূপ আর্থিক সুবিধা প্রদান না করে, তাহা হইলে উহা এই আইনের অধীন একটি প্রতারণামূলক অপরাধ বলিয়া গণ্য হইবে এবং উক্ত অপরাধের জন্য ডেভেলপার অনূর্ধ্ব ২ বছর কারাদণ্ড অথবা অনূর্ধ্ব ২০ লাখ টাকা অর্থদণ্ড অথবা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হইবে।’

কর্ণফুলী গ্রুপে চাকরি করেন জহিরুল হক। তিনি রাজধানীর ২০ শান্তিনগর ভবনে ডম-ইনোর কাছ থেকে ফ্ল্যাট কিনেছেন। ২০০৯ সালে ফ্ল্যাট বিক্রি শুরু করে ২০১৪ সালে হস্তান্তরের কথা ছিল। কিন্তু ১৬ বছরেও ফ্ল্যাট হস্তান্তর করতে পারেনি। এরই মধ্যে ফ্ল্যাট বাবদ অনেকেই শতভাগ অর্থ পরিশোধ করেছেন। আবার অনেকে চুক্তি অনুযায়ী ৯০ শতাংশ অর্থ পরিশোধ করেছেন। এভাবে ডম-ইনোর প্রায় ৮০টি প্রজেক্ট অর্ধ-নির্মিত ও জরাজীর্ণ অবস্থায় দীর্ঘ ১০ থেকে ১৫ বছর ধরে পড়ে আছে।

ডম-ইনোর কাছে ফ্ল্যাট ক্রয় করে প্রতারণার ফাঁদে পড়েছেন আজিজুর রহমান আলম। তিনি কালবেলাকে বলেন, ‘সস্তায় পেয়ে ২০ তলায় ডম-ইনোর কাছ থেকে দুটি ফ্ল্যাট কিনেছিলেন। পরে জানতে পারি ভবনই ১৯ তলার। দীর্ঘ ৯ বছরেও ফ্ল্যাট বুঝে পাইনি। এখন ২০ তলা পর্যন্ত নির্মাণ নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে।’

ডম-ইনোর লোভনীয় অফারের ফাঁদে পড়ে ২০ শান্তিনগর ভবনে দুটি ফ্ল্যাট ক্রয় করেছিলেন রূপা বেগম। তিনি কালবেলাকে বলছেন, ‘দুই বছর আগে ডম-ইনোর কাছে দুটি ফ্ল্যাটের জন্য টাকা দিয়েছি। তবে, ফ্ল্যাট কেনার আগে কাগজপত্র দেখায়নি কোম্পানি। তারা বলেছিল কাগজপত্র কোম্পানির প্রাইভেট বিষয়, দেখানো যাবে না। ডম-ইনো নামিদামি কোম্পানি সেজন্য বিশ্বাস করেছিলাম। বিশ্বাস করে ফাঁদে পড়েছি।’

রূপা বেগম আরও বলেন, ‘শান্তিনগর এলাকায় ফ্ল্যাটের যেমন দাম হওয়ার কথা ছিল, সেই তুলনায় ফ্ল্যাট দুটির দাম অনেক কম ছিল। কম দামের কারণেই ডম-ইনোর ফাঁদে পড়েছি। এই ফাঁদ থেকে বের হওয়ার জন্য ডম-ইনোর সঙ্গে কয়েকবার মিটিং করেছি, জিডি করেছি ও লিগ্যাল নোটিশ পাঠিয়েছি। এমনকি ফ্ল্যাটের জন্য যে টাকা পরিশোধ করেছি, সেখান থেকে কিছুটা টাকা লোকসান হলেও বাকি টাকা ফেরত দিতে প্রস্তাব দিয়েছি। কিন্তু কোনো সমাধান হয়নি।’

তিনি বলেন, ‘ফ্ল্যাট কেনার জন্য যার মাধ্যমে টাকা দিয়েছিলাম তার মোবাইল ফোন বন্ধ, কোনো যোগাযোগ নেই। আবার ডম-ইনোর বনানীর অফিসে যাওয়ার পর যার সঙ্গে কথা বলছি, পরের দিন দেখি তিনি অফিসে নেই। কোম্পানির নানা সমস্যার কারণে অনেকে আবার চাকরি ছেড়ে দিয়েছেন।’

ধানমন্ডির ১৪ নম্বর সড়কের ৮ নম্বর প্লটে ১১ দশমিক ১০ কাঠা জমির ওপর বহুতল আবাসিক ভবন নির্মাণের জন্য ২০১৫ সালের ৯ আগস্ট ভূমির মালিকদের কাছে পাওয়ার অব অ্যাটর্নি নিয়েছিলেন আবদুস সালাম। ভবনে দুটি ফ্ল্যাট কেনার জন্য ডা. আতাউর রহমান ২ কোটি ৭৯ লাখ টাকা পরিশোধ করেন। কিন্তু আবদুস সালাম গোপনে ওই ফ্ল্যাট আরেকজনের কাছে হস্তান্তরের জন্য গণপূর্ত বিভাগের কাছে অনুমতি চান। বিষয়টি বুঝতে পেরে আতাউর রহমান গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের সচিব বরাবর নামঞ্জুরের জন্য আবেদন করেন।

আবাসন ব্যবসার নামে প্রতারণার বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক এবং সমাজ ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক কালবেলাকে বলেন, আবাসন প্রতিষ্ঠান ডম-ইনো বিল্ডার্সের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) আবদুস সালামের বিরুদ্ধে ১৩৬টি প্রতারণার মামলা এক দিনে হয়নি। মামলাগুলো হতে সময় লেগেছে। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলেও রাষ্ট্রের টনক নড়েনি। রাষ্ট্রের উচিত ছিল ডম-ইনোর এমডির বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠার পর তদন্ত কমিটি গঠন করা। তদন্তে অপরাধ প্রমাণিত হলে তার বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণ করা। সেটি না করে অপরাধীকে সুযোগ দেওয়া হয়েছে। ফলে দিনে দিনে অপরাধ বেড়েছে ডম-ইনোর এমডির।

তৌহিদুল হক আরও বলেন, এখন অভিযুক্ত ব্যক্তির ও তার আত্মীয়স্বজনের নামে যত স্থাবর ও অস্থাবর সম্পত্তি রয়েছে, সব বিক্রি করে ভুক্তভোগীদের দেনা-পাওনা পরিশোধ করা উচিত। একটা দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নিলে অন্যরাও এ ধরনের অপরাধ থেকে দূরে থাকবেন। দেশের বাইরে অর্থ পাচার কিংবা অপরাধ করে কিছুদিন শাস্তি ভোগের পরে ভালো থাকা গেলে মানুষ সেই পথেই হাঁটবেন বারবার।

ডম-ইনোর কাছে ফ্ল্যাট কিনে প্রতারণায় পড়া কয়েকজন ফ্ল্যাট মালিক জানান, নির্মাণ সামগ্রীর দাম বাড়ার অজুহাতে পুরোনো চুক্তি লঙ্ঘন করে ক্রেতাদের সঙ্গে নতুন করে চুক্তির ফাঁদ এঁকেছেন ডম-ইনোর এমডি আব্দুস সালাম। ১০ থেকে ১৫ বছর আগে যারা ফ্ল্যাট কেনার জন্য ডম-ইনোর কাছে চুক্তি করেছিলেন, তাদের আগের নির্ধারিত দামের চেয়ে কয়েকগুণ বেশি দামে চুক্তি করার জন্য বলছেন তিনি।

জানা গেছে, ডম-ইনোর এমডি আবদুস সালাম কয়েক দফা কারাগারে গেলেও জামিনে বের হন। তিনি এখন নিয়মিত বনানীতে অফিস করছেন। তবে, ফ্ল্যাট কেনে যারা ভুক্তভোগী হয়েছেন, তাদের কাছ থেকে আড়ালে থাকছেন। অফিসে দায়িত্বরত সিকিউরিটি গার্ডদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে কোনো ক্রেতা যাতে অফিসে ঢুকতে না পারেন।

আবাসন ব্যবসায়ীদের সংগঠন বাংলাদেশ রিয়েল এস্টেট অ্যান্ড হাউজিং অ্যাসোসিয়েশন (রিহ্যাব) ২০০৪ থেকে ২০২৬ সালের এপ্রিল পর্যন্ত ‘রিহ্যাব মেডিয়েশন সেলে’ মোট ১ হাজার ২৩৪টি বিরোধ আপস-মীমাংসা করলেও ডম-ইনোর শত শত অভিযোগ ও প্রতারণার বিষয়গুলো সমাধান করতে পারেনি। ফলে রিহ্যাবের নির্বাচিত কমিটির সিদ্ধান্তে সংগঠনটির মেম্বারশিপ হারায় ডম-ইনো।

আবাসন ব্যবসায়ীদের সংগঠন রিহ্যাবের সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট আব্দুর রাজ্জাক কালবেলাকে বলেন, ‘ফ্ল্যাট বুকিং দেওয়ার আগে ক্রেতাদের উচিত ওই কোম্পানি রিহ্যাবের সদস্য কি না, সেটির খোঁজ নেওয়া। গ্রিনফিল্ড থাকা অবস্থায় কোনো কোম্পানির কাছে ফ্ল্যাট কেনা যাবে না। তবে, ভবন নির্মাণ চলমান থাকাবস্থায় ফ্ল্যাট কিনে নিয়মিত তদারকি করতে হবে।’

এসব নানা অভিযোগের বিষয়ে ডম-ইনোর অফিস নম্বরে ফোন করা হলে প্রতিবেদককে অফিসে যেতে বলেন। পরে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগের জন্য বনানীতে ডম-ইনোর অফিসে গেলেও কোনো জবাব মেলেনি। বেশ কয়েকজন কর্মকর্তা নানা বিষয় জানতে চাইলেও আনুষ্ঠানিক বক্তব্য দিতে রাজি হননি। তবে এক কর্মকর্তা বলেন, ফ্ল্যাট হস্তান্তরের দীর্ঘসূত্রতা নিয়ে কোম্পানির নামে মামলা করে কোনো সমাধান হবে না।

পরে গতকাল রোববার ডম-ইনোর এমডি আবদুস সালামের মোবাইলে ফোন করলে নম্বরটি বন্ধ পাওয়া যায়। তবে হোয়াটসঅ্যাপে খোলা ছিল। এটিতে কল করা হলেও তিনি ধরেননি। পরে হোয়াটসঅ্যাপে প্রশ্ন লিখে পাঠানো হয়, এরও কোনো জবাব দেননি তিনি।


বাংলা গ্লোবাল বুলেটিন

সম্পাদক ও প্রকাশক : এম. আর. আলম
নির্বাহী সম্পাদক : মোঃ মহসিন পারভেজ

কপিরাইট © ২০২৬ বাংলা গ্লোবাল বুলেটিন । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত