উঠানের সেই ধুলোমাখা পথটা আজও আগের মতোই রয়েছে। পালটে গেছে কেবল চেনা মুখগুলো। কারও শরীরে বার্ধক্যের ছাপ, কেউ বা দীর্ঘ চার দশকে পাড়ি দিয়েছেন না ফেরার দেশে। কিন্তু যার নাম একদিন খেরোখাতায় ‘মৃত’ বলে ধরে নিয়েছিল পরিবার, সেই কিশোরীই আজ প্রৌঢ়ত্বের ছায়া নিয়ে ফিরে এলেন ভিটেয়। ৪০ বছর আগে হারিয়ে যাওয়া জাহানারার প্রত্যাবর্তনে ঠাকুরগাঁওয়ের সালন্দর ইউনিয়নের শাহাপাড়া গ্রামে এখন শুধুই অশ্রু আর উল্লাসের সহাবস্থান।
ঠিক যেন হারানো প্রাপ্তির রূপকথা। আশির দশকের মাঝামাঝি প্রতিবেশী এক আত্মীয়ের মায়াজালে পড়ে ঘর ছেড়েছিলেন কিশোরী জাহানারা। তারপর আকাশ-পাতাল এক করেও হদিস মেলেনি তার। পরিবারের বুকচেরা আর্তনাদ একসময় থিতু হয় দীর্ঘশ্বাসে; ধরে নেওয়া হয় আদরের বোনটি আর ইহজগতে নেই। কিন্তু নিয়তি অন্য এক চিত্রনাট্য লিখে রেখেছিল সুদূর ভারতের পাঞ্জাবে।
সোমবার সকালে যখন শাহাপাড়া গ্রামের সেই পুরোনো উঠানে জাহানারা (৫৫) পা রাখলেন, তখন সময় যেন আক্ষরিক অর্থেই থমকে দাঁড়িয়েছিল। সঙ্গে ৩০ বছর বয়সি ছেলে মানজিদার সিং। চার সন্তান ও সাজানো সংসার ফেলে শুধু ‘শেকড়ের টানে’ পাঞ্জাব থেকে বাংলাদেশে ছুটে এসেছেন তিনি। বড় ভাই আব্দুল কুদ্দুসকে জড়িয়ে ধরে যখন কান্নায় ভেঙে পড়লেন জাহানারা, উপস্থিত শতশত মানুষের চোখে তখন জলের ধারা।
বাষ্পরুদ্ধ কণ্ঠে কুদ্দুস বলেন, পাশের বাড়ির এক আত্মীয় ওকে কৌশলে নিয়ে গিয়ে বিক্রি করে দিয়েছিল। হন্যে হয়ে খুঁজেও পাইনি তখন। আজ মনে হচ্ছে শুকনো মরা গাছে হঠাৎ ফুল ফুটেছে।
আরেক ভাই মোজাম্মেল হক যেন ভাষা হারিয়ে ফেলেছেন। তার কথায়, রক্ত কী আর ভুলে থাকা যায়? শৈশবের সেই চঞ্চল মুখটা দেখামাত্রই চিনে ফেলেছি। মনে হচ্ছে হারানো কলিজাটা ফিরে পেলাম।
ভাতিজি লাবণী আক্তার বলছিলেন, ফুপুর গল্প এতদিন রূপকথার মতো শুনেছি। আজ তাকে সরাসরি জড়িয়ে ধরতে পেরে আমাদের পরিবারের দীর্ঘদিনের এক অপূর্ণতা ঘুচল। প্রবীণ বাসিন্দা হাশেম আলীর মতে, দীর্ঘ ৪০ বছর পর ফিরে আসা প্রমাণ করে রক্তের টান সীমান্তের কাঁটাতারের চেয়েও শক্তিশালী।
তবে এই মিলন দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার নয়। জাহানারার বর্তমান জীবন এখন পাঞ্জাবের তাংতারা এলাকায়। সেখানে স্বামী ও অন্য সন্তানরা পথ চেয়ে আছেন। ছেলে মানজিদার সিং জানান, মায়ের শেষ ইচ্ছে পূরণ করতেই তাকে নিয়ে আসা। মঙ্গলবার বিকালেই তাদের ঢাকার উদ্দেশে রওয়ানা দেওয়ার কথা, যেখান থেকে ফিরে যাবেন কর্মস্থলে।
যাওয়ার বেলা অশ্রুসিক্ত নয়নে জাহানারা বলেন, ভেবেছিলাম কোনোদিন আর এই মাটি স্পর্শ করতে পারব না। ভাইদের মুখ দেখে মরতে পারছি, এটাই পরম পাওয়া। এখন মরেও শান্তি পাব।

বুধবার, ০৬ মে ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০৬ মে ২০২৬
উঠানের সেই ধুলোমাখা পথটা আজও আগের মতোই রয়েছে। পালটে গেছে কেবল চেনা মুখগুলো। কারও শরীরে বার্ধক্যের ছাপ, কেউ বা দীর্ঘ চার দশকে পাড়ি দিয়েছেন না ফেরার দেশে। কিন্তু যার নাম একদিন খেরোখাতায় ‘মৃত’ বলে ধরে নিয়েছিল পরিবার, সেই কিশোরীই আজ প্রৌঢ়ত্বের ছায়া নিয়ে ফিরে এলেন ভিটেয়। ৪০ বছর আগে হারিয়ে যাওয়া জাহানারার প্রত্যাবর্তনে ঠাকুরগাঁওয়ের সালন্দর ইউনিয়নের শাহাপাড়া গ্রামে এখন শুধুই অশ্রু আর উল্লাসের সহাবস্থান।
ঠিক যেন হারানো প্রাপ্তির রূপকথা। আশির দশকের মাঝামাঝি প্রতিবেশী এক আত্মীয়ের মায়াজালে পড়ে ঘর ছেড়েছিলেন কিশোরী জাহানারা। তারপর আকাশ-পাতাল এক করেও হদিস মেলেনি তার। পরিবারের বুকচেরা আর্তনাদ একসময় থিতু হয় দীর্ঘশ্বাসে; ধরে নেওয়া হয় আদরের বোনটি আর ইহজগতে নেই। কিন্তু নিয়তি অন্য এক চিত্রনাট্য লিখে রেখেছিল সুদূর ভারতের পাঞ্জাবে।
সোমবার সকালে যখন শাহাপাড়া গ্রামের সেই পুরোনো উঠানে জাহানারা (৫৫) পা রাখলেন, তখন সময় যেন আক্ষরিক অর্থেই থমকে দাঁড়িয়েছিল। সঙ্গে ৩০ বছর বয়সি ছেলে মানজিদার সিং। চার সন্তান ও সাজানো সংসার ফেলে শুধু ‘শেকড়ের টানে’ পাঞ্জাব থেকে বাংলাদেশে ছুটে এসেছেন তিনি। বড় ভাই আব্দুল কুদ্দুসকে জড়িয়ে ধরে যখন কান্নায় ভেঙে পড়লেন জাহানারা, উপস্থিত শতশত মানুষের চোখে তখন জলের ধারা।
বাষ্পরুদ্ধ কণ্ঠে কুদ্দুস বলেন, পাশের বাড়ির এক আত্মীয় ওকে কৌশলে নিয়ে গিয়ে বিক্রি করে দিয়েছিল। হন্যে হয়ে খুঁজেও পাইনি তখন। আজ মনে হচ্ছে শুকনো মরা গাছে হঠাৎ ফুল ফুটেছে।
আরেক ভাই মোজাম্মেল হক যেন ভাষা হারিয়ে ফেলেছেন। তার কথায়, রক্ত কী আর ভুলে থাকা যায়? শৈশবের সেই চঞ্চল মুখটা দেখামাত্রই চিনে ফেলেছি। মনে হচ্ছে হারানো কলিজাটা ফিরে পেলাম।
ভাতিজি লাবণী আক্তার বলছিলেন, ফুপুর গল্প এতদিন রূপকথার মতো শুনেছি। আজ তাকে সরাসরি জড়িয়ে ধরতে পেরে আমাদের পরিবারের দীর্ঘদিনের এক অপূর্ণতা ঘুচল। প্রবীণ বাসিন্দা হাশেম আলীর মতে, দীর্ঘ ৪০ বছর পর ফিরে আসা প্রমাণ করে রক্তের টান সীমান্তের কাঁটাতারের চেয়েও শক্তিশালী।
তবে এই মিলন দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার নয়। জাহানারার বর্তমান জীবন এখন পাঞ্জাবের তাংতারা এলাকায়। সেখানে স্বামী ও অন্য সন্তানরা পথ চেয়ে আছেন। ছেলে মানজিদার সিং জানান, মায়ের শেষ ইচ্ছে পূরণ করতেই তাকে নিয়ে আসা। মঙ্গলবার বিকালেই তাদের ঢাকার উদ্দেশে রওয়ানা দেওয়ার কথা, যেখান থেকে ফিরে যাবেন কর্মস্থলে।
যাওয়ার বেলা অশ্রুসিক্ত নয়নে জাহানারা বলেন, ভেবেছিলাম কোনোদিন আর এই মাটি স্পর্শ করতে পারব না। ভাইদের মুখ দেখে মরতে পারছি, এটাই পরম পাওয়া। এখন মরেও শান্তি পাব।

আপনার মতামত লিখুন