ঢাকা    বুধবার, ০১ জুলাই ২০২৬
বাংলা গ্লোবাল বুলেটিন

দেশের বিভিন্ন জেলায় একযোগে পতাকা টানানোর ঘটনায় তদন্তে নেমেছে পুলিশ ও গোয়েন্দা সংস্থা।

দেশজুড়ে ‘সাদা পতাকা’ রহস্য, নেপথ্যে কারা?



দেশজুড়ে ‘সাদা পতাকা’ রহস্য, নেপথ্যে কারা?

গত কয়েক দিন দেশের বিভিন্ন জেলা, বিশেষ করে প্রত্যন্ত অঞ্চলের ব্রিজ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং গ্রামীণ হাটবাজারসহ নানা স্থানে রহস্যজনকভাবে আরবি লেখা ‘সাদা পতাকা’ উড়তে দেখা গেছে। এ নিয়ে দেশজুড়ে চলছে তোলপাড়। এর আড়ালে চরমপন্থি ও উগ্রবাদী সংগঠনগুলো নতুন করে সংগঠিত হওয়ার চেষ্টা করছে বলে গোয়েন্দা প্রতিবেদনে উঠেছে এসেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘সাদা পতাকার’ আড়ালে অশান্তির ছক আঁকা হচ্ছে। দেশের এজেন্টদের পাশাপাশি ভিনদেশি সংস্থার ইন্ধন রয়েছে। ওই প্রতিবেদনের আলোকে পুলিশের সবকটি ইউনিটকে বিশেষ চিঠি দিয়েছে বলে পুলিশের একটি সূত্র জানিয়েছে। এদিকে পতাকার ইস্যুটি সরকার খতিয়ে দেখছে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর তথ্য উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান। তিনি বলেন, এর পেছনে নিশ্চয়ই কোনো সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা আছে।

এদিকে বিষয়টি সরকারের নীতিনির্ধারক থেকে শুরু করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে ভাবিয়ে তুলেছে। এই ঘটনায় পুলিশ সদর দপ্তরে কয়েক দফা বৈঠক হয়েছে। ইতিমধ্যে উদ্বেগ জানিয়ে গত শনিবার একটি গোয়েন্দা সংস্থা গোপন প্রতিবেদন পাঠিয়েছে পুলিশ সদর দপ্তর ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে।

পুলিশ সংশ্লিষ্টরা জানান, বিগত সময়ে নিষিদ্ধ হওয়া বিভিন্ন উগ্রবাদী সংগঠনের খ- খণ্ড অংশ এই কর্মকা-ের পেছনে কলকাঠি নাড়ছে। সামাজিক মাধ্যম এবং মাঠপর্যায়ে উসকানি দিয়ে তরুণদের মগজ ধোলাইয়ের এক নতুন কৌশল হিসেবে ‘সাদা পতাকাকে’ ব্যবহার করছে। বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে নিয়ে পুলিশ ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলো দেশজুড়ে সর্বোচ্চ সতর্কতা জারি করেছে।

পুলিশের অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক (ক্রাইম অ্যান্ড অপস) খোন্দকার রফিকুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, কোনো স্বার্থান্বেষী মহল সংবেদনশীল বিষয়কে কেন্দ্র করে উসকানি দিয়ে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা বা আইনশৃঙ্খলার অবনতি ঘটাতে না পারে, সে জন্য সর্বোচ্চ সতর্ক থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সামাজিক মাধ্যমে বিভ্রান্তিমূলক তথ্য ও গুজব ছড়িয়ে যেন কেউ পরিস্থিতি ঘোলাটে করতে না পারে, সেদিকে তীক্ষè নজর রাখা হচ্ছে।

পুলিশের জরুরি বৈঠক : সর্বশেষ গত রবিবার পুলিশ সদর দপ্তরে জরুরি বৈঠক হয়েছে। বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন পুলিশের মহাপরিদর্শক, সব অতিরিক্ত আইজিপি, ডিএমপি কমিশনার, ডিআইজিসহ অন্য কর্তারা। আর ভার্চুয়ালি যুক্ত ছিলেন সব মহানগর পুলিশ কমিশনার, রেঞ্জ ডিআইজি, জেলার পুলিশ সুপার ও ইউনিট প্রধানরা। এতে ‘সাদা পতাকা’ টানানো নিয়ে বিশদ আলোচনা হয়েছে। বৈঠকে উপস্থিত থাকা পুলিশের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, যেকোনো মূল্যে সাদা পতাকা মিছিল বন্ধ করতে বলা হয়েছে। এসবের সঙ্গে যারা সম্পৃক্ত তাদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনা হচ্ছে। ইতিমধ্যে ২৪টি আইডি ব্লক করা হয়েছে। বিদেশি কিছু সংগঠন বাংলাদেশের ‘কতিপয় লোকের’ সঙ্গে আঁতাত করে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির পাঁয়তারা করছে। বৈঠকে বলা হয়েছে, হামাস বা বিভিন্ন জঙ্গি সংগঠনের নামে সাদা পতাকা মিছিল কোনোভাবে মেনে নেওয়া হবে না। নিষিদ্ধসংগঠনগুলোর বিষয়ে মনিটরিং আরও জোরদার করতে বলা হয়েছে। সাধারণ মানুষকে সম্পৃক্ত করে মিছিলের আড়ালে আকস্মিক নাশকতা সৃষ্টি করা হতে পারে বলে আমরা তথ্য পেয়েছি। জনবহুল এলাকাগুলো টার্গেট করা হচ্ছে। স্পর্শকাতর পয়েন্টগুলোতে পুলিশ ও র‌্যাবের পাশাপাশি যৌথ বাহিনীর টহল ও নজরদারি বাড়ানো হবে।

ইউনিট প্রধানদের কাছে ‘বিশেষ চিঠি’: পুলিশ সূত্র জানায়, যেকোনো ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে পুলিশ সদর দপ্তর থেকে দেশের সবকটি ইউনিট, রেঞ্জ ডিআইজি, ৬৪ জেলার পুলিশ সুপারসহ অন্য কর্মকর্তাদের কাছ ‘বিশেষ চিঠি’ পাঠানো হয়েছে। চিঠিতে আকস্মিকভাবে সাদা পতাকা টানানোর ঘটনাগুলোকে গুরুত্ব সহকারে খতিয়ে দেখতে বলা হয়েছে। আরও বলা হয়েছে, যেসব স্থানে এসব পতাকা পাওয়া যাচ্ছে, তার চারপাশের নিরাপত্তা জোরদারসহ স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও ইমামদের সঙ্গে সচেতনতামূলক বৈঠক করতে হবে। কোন গোষ্ঠী বা চক্র এর পেছনে আছে তা দ্রুত চিহ্নিত করতে হবে। এই প্রসঙ্গে পুলিশ সদর দপ্তরের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা বলেন, ‘উগ্রবাদীরা সবসময় কৌশল পরিবর্তন করে। যখনই তাদের পুরনো নেটওয়ার্ক ভেঙে দেওয়া হয়, তারা নতুন কিছু নিয়ে মাঠে নামার চেষ্টা করে। সাদা পতাকা তেমনই একটি নতুন কৌশল হতে পারে বলে আমরা অনেকটা নিশ্চিত হয়েছি।

উসকানিদাতাদের তথ্য গোয়েন্দা টেবিলে : পতাকা টানানোর দৃশ্যমান কর্মকাণ্ডের পাশাপাশি এর পেছনে যারা অর্থায়ন, পরিকল্পনা এবং সাইবার স্পেসে উসকানি দিচ্ছে, তাদের একটি বড় তালিকা ইতিমধ্যেই গোয়েন্দাদের কাছে এসেছে। বেশ কিছুদিন ধরেই টেলিগ্রাম, সিগন্যাল ও ফেসবুকে ভুয়া আইডি ব্যবহার করে সুনির্দিষ্ট প্রচার চালাচ্ছে। গোয়েন্দারা নিশ্চিত হয়েছেন, যারা সরাসরি মাঠে নামেন না, কিন্তু বিভিন্ন ইস্যুতে ধর্মের অপব্যাখ্যা দিয়ে তরুণদের মগজ ধোলাই করেন এবং হিজরতের জন্য উদ্বুদ্ধ করছেন কেউ কেউ। এই কর্মকা-ের জন্য দেশ-বিদেশ থেকে ক্রিপ্টোকারেন্সি বা হুন্ডির মাধ্যমে অর্থ আসছে।

২৪টি ফেসবুক আইডি শনাক্ত : পুলিশের একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত ২৪ জুন জেলার বিভিন্ন স্থানে সাদা পতাকা টানানো হয়। কোথাও কোথাও র‌্যালি, বাইক শোডাউনও হয়েছে। ইতিমধ্যে পোস্টকারী ২৪টি ফেসবুক আইডি শনাক্ত করে সংশ্লিষ্ট দপ্তরে প্রতিবেদন পাঠানো হয়েছে। আইডির বিষয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়, বাঁশের খুঁটিতে লাগানো কালো কাপড়ে ‘আল্লাহু’ লেখা পতাকা হাতে এক যুবকের ছবি পোস্ট করা হয় ‘শফিকুল ইসলাম শফিক’ নামের একটি আইডিতে। এতে লেখা হয়, সাভারের বিভিন্ন জায়গায় কালিমার পতাকা উত্তোলন। ‘তরিকুল ইসলাম তাকি’ নামে একটি আইডিতে কালেমার পতাকা হাতে বাইক শোডাউনের একটি ভিডিও পোস্ট করা হয়। আড়াইহাজারে মোটরবাইক র‌্যালির ছবি পোস্ট করা হয় ‘শিবলী ইবনে উসমানী’ আইডিতে। ‘কালিমার পতাকা অবমাননার প্রতিবাদে এক হাজার কালিমা খচিত পতাকা নিয়ে বিক্ষোভ মিছিলের ডাক দেন শেরপুরের একটি মসজিদের ‘খতিব’। ছবি পোস্ট করে ‘অনেশন’ নামে একটি আইডি থেকে এমনঘোষণা দেওয়া হয়। যাত্রাবাড়ীর হানিফ ফ্লাইওভার থেকে পতাকা নামিয়ে ফেলার প্রতিবাদে ব্রাহ্মণবাড়িয়া সরকারি কলেজে পতাকা উত্তোলন করা হয়। একদল যুবকের হাতে সেই পতাকা একটি আরবি নামের আইডিতে পোস্ট করা হয়। কুমিল্লার মনোহরগঞ্জের শান্তিরবাজার ও চাঁদপুরের শাহরাস্তি উপজেলার চিতোষী বাজার ব্রিজে আর্জেন্টিনা ও ব্রাজিলের পতাকার সঙ্গে আল্লাহু লেখা সাদা পতাকার ছবি পোস্ট করা হয় ‘নাজিম উদ্দিন সজিব’ নামে একটি আইডিতে।

গত ২৪ জুন রাজধানীর যাত্রাবাড়ীর শনির আখড়ায় কালিমার পতাকা হাতে র‌্যালি করে একদল যুবক। পরে সেই ছবি ‘তামিম আল আদনান’ নামে একটি ফেসবুক আইডিতে পোস্ট করা হয়। একই দিন যাত্রাবাড়ী হানিফ ফ্লাইওভারে কালিমার পতাকা লাগায় কে বা কারা। আব্দুল্লাহপুর থেকে গাজীপুর চৌরাস্তার টঙ্গী এলাকার ফ্লাইওভারের নিচেও ওই দিন পতাকা লাগানো হয়। ২২ জুলাই জামালপুরের ইসলামপুর ডিগ্রিরচর জামিয়া মফিজিয়া মাদ্রাসা থেকে ডেফলা ব্রিজ পর্যন্ত পতাকার শোভাযাত্রা অনুষ্ঠিত হয়। নাবাবগঞ্জে বাহ্রা বাজারে ‘আল খিদমাহ্ সেবা সংস্থা’র পক্ষ থেকে পতাকা উত্তোলন কর্মসূচির ঘোষণা দিয়ে লোকজনের হাতে পতাকা সংবলিত ছবি পোস্ট করা হয় ‘এমডি তারিকুল ইসলাম মোল্লা’ আইডিতে। নরসিংদীর মাধবদীতে পতাকা নিয়ে মিছিল করার ছবি পোস্ট করা হয় ‘নরসিংদী জনকণ্ঠ’ আইডিতে। মৌলভীবাজারের চাঁদনীঘাটে কালিমার পতাকা খুলে নেওয়ার সময় জনতার হাতে একজন আটকের ছবি পোস্ট করা হয় ‘শোয়াব আব্দুল্লাহ’ নামক আইডিতে। চট্টগ্রামের শাহ আমানত সেতুতে পতাকা স্থাপনের ছবি পোস্ট করা হয়‘এমডি আশেক’ আইডিতে।

সিসিটিভির ফুটেজ সংগ্রহ : বিভিন্ন স্থান থেকে সিসিটিভির ফুটেজ সংগ্রহ করেছে পুলিশ। ফুটেজে দেখা গেছে, গভীর রাতে বা ভোরের আলো ফোটার আগে মোটরসাইকেলে করে এসে হেলমেট বা মাস্ক পরিহিত দুই-তিনজন যুবক দ্রুত পতাকাগুলো টানিয়ে চলে গেছে। ফুটেজগুলো বিশ্লেষণ করে বেশ কয়েকজন সন্দেহভাজনের প্রোফাইল তৈরি করা হয়েছে। তাদের মোবাইল গতিবিধি পর্যবেক্ষণের পাশাপাশি উগ্রবাদী লিঙ্কের সন্ধান মিলছে। ব্রিজ, হাটবাজার, স্কুল, কলেজসহ বিভিন্নস্থানে পতাকা টানানো হচ্ছে। খতিয়ে দেখছে সরকার : তথ্য উপদেষ্টা

দেশের বিভিন্ন এলাকায় আরবি হরফ সংবলিত সাদা পতাকা টানানোর বিষয়টি সরকারের নজরে আছে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর তথ্য উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান। গতকাল মঙ্গলবার সচিবালয়ে সাপ্তাহিক সংবাদ সম্মেলনে গণমাধ্যমকর্মীদের প্রশ্নের জবাবে তিনি এ কথা বলেন। উপদেষ্টা বলেন, ‘এটা সরকার নজরে নিয়েছে। এটা সরকার খতিয়ে দেখছে। কারণ এটা নিয়ে কিছু কিছু ক্ষেত্রে ভুল বার্তা যাওয়ার সম্ভাবনা আছে গ্লোবালি। এ ব্যাপারে আমরা সচেতন আছি। আমরা এটা নিয়ে ব্যবস্থা নিতে যাচ্ছি এবং আমি ব্যক্তিগতভাবেও এ ব্যাপারে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করেছি। এর পেছনে নিশ্চয়ই কোনো সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা আছে। সেটাই আমরা খতিয়ে দেখছি।

বিষয় : সাদা পতাকা জাহেদ উর রহমান

আপনার মতামত লিখুন

বাংলা গ্লোবাল বুলেটিন

বুধবার, ০১ জুলাই ২০২৬


দেশজুড়ে ‘সাদা পতাকা’ রহস্য, নেপথ্যে কারা?

প্রকাশের তারিখ : ০১ জুলাই ২০২৬

featured Image

গত কয়েক দিন দেশের বিভিন্ন জেলা, বিশেষ করে প্রত্যন্ত অঞ্চলের ব্রিজ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং গ্রামীণ হাটবাজারসহ নানা স্থানে রহস্যজনকভাবে আরবি লেখা ‘সাদা পতাকা’ উড়তে দেখা গেছে। এ নিয়ে দেশজুড়ে চলছে তোলপাড়। এর আড়ালে চরমপন্থি ও উগ্রবাদী সংগঠনগুলো নতুন করে সংগঠিত হওয়ার চেষ্টা করছে বলে গোয়েন্দা প্রতিবেদনে উঠেছে এসেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘সাদা পতাকার’ আড়ালে অশান্তির ছক আঁকা হচ্ছে। দেশের এজেন্টদের পাশাপাশি ভিনদেশি সংস্থার ইন্ধন রয়েছে। ওই প্রতিবেদনের আলোকে পুলিশের সবকটি ইউনিটকে বিশেষ চিঠি দিয়েছে বলে পুলিশের একটি সূত্র জানিয়েছে। এদিকে পতাকার ইস্যুটি সরকার খতিয়ে দেখছে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর তথ্য উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান। তিনি বলেন, এর পেছনে নিশ্চয়ই কোনো সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা আছে।

এদিকে বিষয়টি সরকারের নীতিনির্ধারক থেকে শুরু করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে ভাবিয়ে তুলেছে। এই ঘটনায় পুলিশ সদর দপ্তরে কয়েক দফা বৈঠক হয়েছে। ইতিমধ্যে উদ্বেগ জানিয়ে গত শনিবার একটি গোয়েন্দা সংস্থা গোপন প্রতিবেদন পাঠিয়েছে পুলিশ সদর দপ্তর ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে।

পুলিশ সংশ্লিষ্টরা জানান, বিগত সময়ে নিষিদ্ধ হওয়া বিভিন্ন উগ্রবাদী সংগঠনের খ- খণ্ড অংশ এই কর্মকা-ের পেছনে কলকাঠি নাড়ছে। সামাজিক মাধ্যম এবং মাঠপর্যায়ে উসকানি দিয়ে তরুণদের মগজ ধোলাইয়ের এক নতুন কৌশল হিসেবে ‘সাদা পতাকাকে’ ব্যবহার করছে। বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে নিয়ে পুলিশ ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলো দেশজুড়ে সর্বোচ্চ সতর্কতা জারি করেছে।

পুলিশের অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক (ক্রাইম অ্যান্ড অপস) খোন্দকার রফিকুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, কোনো স্বার্থান্বেষী মহল সংবেদনশীল বিষয়কে কেন্দ্র করে উসকানি দিয়ে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা বা আইনশৃঙ্খলার অবনতি ঘটাতে না পারে, সে জন্য সর্বোচ্চ সতর্ক থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সামাজিক মাধ্যমে বিভ্রান্তিমূলক তথ্য ও গুজব ছড়িয়ে যেন কেউ পরিস্থিতি ঘোলাটে করতে না পারে, সেদিকে তীক্ষè নজর রাখা হচ্ছে।

পুলিশের জরুরি বৈঠক : সর্বশেষ গত রবিবার পুলিশ সদর দপ্তরে জরুরি বৈঠক হয়েছে। বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন পুলিশের মহাপরিদর্শক, সব অতিরিক্ত আইজিপি, ডিএমপি কমিশনার, ডিআইজিসহ অন্য কর্তারা। আর ভার্চুয়ালি যুক্ত ছিলেন সব মহানগর পুলিশ কমিশনার, রেঞ্জ ডিআইজি, জেলার পুলিশ সুপার ও ইউনিট প্রধানরা। এতে ‘সাদা পতাকা’ টানানো নিয়ে বিশদ আলোচনা হয়েছে। বৈঠকে উপস্থিত থাকা পুলিশের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, যেকোনো মূল্যে সাদা পতাকা মিছিল বন্ধ করতে বলা হয়েছে। এসবের সঙ্গে যারা সম্পৃক্ত তাদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনা হচ্ছে। ইতিমধ্যে ২৪টি আইডি ব্লক করা হয়েছে। বিদেশি কিছু সংগঠন বাংলাদেশের ‘কতিপয় লোকের’ সঙ্গে আঁতাত করে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির পাঁয়তারা করছে। বৈঠকে বলা হয়েছে, হামাস বা বিভিন্ন জঙ্গি সংগঠনের নামে সাদা পতাকা মিছিল কোনোভাবে মেনে নেওয়া হবে না। নিষিদ্ধসংগঠনগুলোর বিষয়ে মনিটরিং আরও জোরদার করতে বলা হয়েছে। সাধারণ মানুষকে সম্পৃক্ত করে মিছিলের আড়ালে আকস্মিক নাশকতা সৃষ্টি করা হতে পারে বলে আমরা তথ্য পেয়েছি। জনবহুল এলাকাগুলো টার্গেট করা হচ্ছে। স্পর্শকাতর পয়েন্টগুলোতে পুলিশ ও র‌্যাবের পাশাপাশি যৌথ বাহিনীর টহল ও নজরদারি বাড়ানো হবে।

ইউনিট প্রধানদের কাছে ‘বিশেষ চিঠি’: পুলিশ সূত্র জানায়, যেকোনো ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে পুলিশ সদর দপ্তর থেকে দেশের সবকটি ইউনিট, রেঞ্জ ডিআইজি, ৬৪ জেলার পুলিশ সুপারসহ অন্য কর্মকর্তাদের কাছ ‘বিশেষ চিঠি’ পাঠানো হয়েছে। চিঠিতে আকস্মিকভাবে সাদা পতাকা টানানোর ঘটনাগুলোকে গুরুত্ব সহকারে খতিয়ে দেখতে বলা হয়েছে। আরও বলা হয়েছে, যেসব স্থানে এসব পতাকা পাওয়া যাচ্ছে, তার চারপাশের নিরাপত্তা জোরদারসহ স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও ইমামদের সঙ্গে সচেতনতামূলক বৈঠক করতে হবে। কোন গোষ্ঠী বা চক্র এর পেছনে আছে তা দ্রুত চিহ্নিত করতে হবে। এই প্রসঙ্গে পুলিশ সদর দপ্তরের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা বলেন, ‘উগ্রবাদীরা সবসময় কৌশল পরিবর্তন করে। যখনই তাদের পুরনো নেটওয়ার্ক ভেঙে দেওয়া হয়, তারা নতুন কিছু নিয়ে মাঠে নামার চেষ্টা করে। সাদা পতাকা তেমনই একটি নতুন কৌশল হতে পারে বলে আমরা অনেকটা নিশ্চিত হয়েছি।

উসকানিদাতাদের তথ্য গোয়েন্দা টেবিলে : পতাকা টানানোর দৃশ্যমান কর্মকাণ্ডের পাশাপাশি এর পেছনে যারা অর্থায়ন, পরিকল্পনা এবং সাইবার স্পেসে উসকানি দিচ্ছে, তাদের একটি বড় তালিকা ইতিমধ্যেই গোয়েন্দাদের কাছে এসেছে। বেশ কিছুদিন ধরেই টেলিগ্রাম, সিগন্যাল ও ফেসবুকে ভুয়া আইডি ব্যবহার করে সুনির্দিষ্ট প্রচার চালাচ্ছে। গোয়েন্দারা নিশ্চিত হয়েছেন, যারা সরাসরি মাঠে নামেন না, কিন্তু বিভিন্ন ইস্যুতে ধর্মের অপব্যাখ্যা দিয়ে তরুণদের মগজ ধোলাই করেন এবং হিজরতের জন্য উদ্বুদ্ধ করছেন কেউ কেউ। এই কর্মকা-ের জন্য দেশ-বিদেশ থেকে ক্রিপ্টোকারেন্সি বা হুন্ডির মাধ্যমে অর্থ আসছে।

২৪টি ফেসবুক আইডি শনাক্ত : পুলিশের একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত ২৪ জুন জেলার বিভিন্ন স্থানে সাদা পতাকা টানানো হয়। কোথাও কোথাও র‌্যালি, বাইক শোডাউনও হয়েছে। ইতিমধ্যে পোস্টকারী ২৪টি ফেসবুক আইডি শনাক্ত করে সংশ্লিষ্ট দপ্তরে প্রতিবেদন পাঠানো হয়েছে। আইডির বিষয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়, বাঁশের খুঁটিতে লাগানো কালো কাপড়ে ‘আল্লাহু’ লেখা পতাকা হাতে এক যুবকের ছবি পোস্ট করা হয় ‘শফিকুল ইসলাম শফিক’ নামের একটি আইডিতে। এতে লেখা হয়, সাভারের বিভিন্ন জায়গায় কালিমার পতাকা উত্তোলন। ‘তরিকুল ইসলাম তাকি’ নামে একটি আইডিতে কালেমার পতাকা হাতে বাইক শোডাউনের একটি ভিডিও পোস্ট করা হয়। আড়াইহাজারে মোটরবাইক র‌্যালির ছবি পোস্ট করা হয় ‘শিবলী ইবনে উসমানী’ আইডিতে। ‘কালিমার পতাকা অবমাননার প্রতিবাদে এক হাজার কালিমা খচিত পতাকা নিয়ে বিক্ষোভ মিছিলের ডাক দেন শেরপুরের একটি মসজিদের ‘খতিব’। ছবি পোস্ট করে ‘অনেশন’ নামে একটি আইডি থেকে এমনঘোষণা দেওয়া হয়। যাত্রাবাড়ীর হানিফ ফ্লাইওভার থেকে পতাকা নামিয়ে ফেলার প্রতিবাদে ব্রাহ্মণবাড়িয়া সরকারি কলেজে পতাকা উত্তোলন করা হয়। একদল যুবকের হাতে সেই পতাকা একটি আরবি নামের আইডিতে পোস্ট করা হয়। কুমিল্লার মনোহরগঞ্জের শান্তিরবাজার ও চাঁদপুরের শাহরাস্তি উপজেলার চিতোষী বাজার ব্রিজে আর্জেন্টিনা ও ব্রাজিলের পতাকার সঙ্গে আল্লাহু লেখা সাদা পতাকার ছবি পোস্ট করা হয় ‘নাজিম উদ্দিন সজিব’ নামে একটি আইডিতে।

গত ২৪ জুন রাজধানীর যাত্রাবাড়ীর শনির আখড়ায় কালিমার পতাকা হাতে র‌্যালি করে একদল যুবক। পরে সেই ছবি ‘তামিম আল আদনান’ নামে একটি ফেসবুক আইডিতে পোস্ট করা হয়। একই দিন যাত্রাবাড়ী হানিফ ফ্লাইওভারে কালিমার পতাকা লাগায় কে বা কারা। আব্দুল্লাহপুর থেকে গাজীপুর চৌরাস্তার টঙ্গী এলাকার ফ্লাইওভারের নিচেও ওই দিন পতাকা লাগানো হয়। ২২ জুলাই জামালপুরের ইসলামপুর ডিগ্রিরচর জামিয়া মফিজিয়া মাদ্রাসা থেকে ডেফলা ব্রিজ পর্যন্ত পতাকার শোভাযাত্রা অনুষ্ঠিত হয়। নাবাবগঞ্জে বাহ্রা বাজারে ‘আল খিদমাহ্ সেবা সংস্থা’র পক্ষ থেকে পতাকা উত্তোলন কর্মসূচির ঘোষণা দিয়ে লোকজনের হাতে পতাকা সংবলিত ছবি পোস্ট করা হয় ‘এমডি তারিকুল ইসলাম মোল্লা’ আইডিতে। নরসিংদীর মাধবদীতে পতাকা নিয়ে মিছিল করার ছবি পোস্ট করা হয় ‘নরসিংদী জনকণ্ঠ’ আইডিতে। মৌলভীবাজারের চাঁদনীঘাটে কালিমার পতাকা খুলে নেওয়ার সময় জনতার হাতে একজন আটকের ছবি পোস্ট করা হয় ‘শোয়াব আব্দুল্লাহ’ নামক আইডিতে। চট্টগ্রামের শাহ আমানত সেতুতে পতাকা স্থাপনের ছবি পোস্ট করা হয়‘এমডি আশেক’ আইডিতে।

সিসিটিভির ফুটেজ সংগ্রহ : বিভিন্ন স্থান থেকে সিসিটিভির ফুটেজ সংগ্রহ করেছে পুলিশ। ফুটেজে দেখা গেছে, গভীর রাতে বা ভোরের আলো ফোটার আগে মোটরসাইকেলে করে এসে হেলমেট বা মাস্ক পরিহিত দুই-তিনজন যুবক দ্রুত পতাকাগুলো টানিয়ে চলে গেছে। ফুটেজগুলো বিশ্লেষণ করে বেশ কয়েকজন সন্দেহভাজনের প্রোফাইল তৈরি করা হয়েছে। তাদের মোবাইল গতিবিধি পর্যবেক্ষণের পাশাপাশি উগ্রবাদী লিঙ্কের সন্ধান মিলছে। ব্রিজ, হাটবাজার, স্কুল, কলেজসহ বিভিন্নস্থানে পতাকা টানানো হচ্ছে। খতিয়ে দেখছে সরকার : তথ্য উপদেষ্টা

দেশের বিভিন্ন এলাকায় আরবি হরফ সংবলিত সাদা পতাকা টানানোর বিষয়টি সরকারের নজরে আছে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর তথ্য উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান। গতকাল মঙ্গলবার সচিবালয়ে সাপ্তাহিক সংবাদ সম্মেলনে গণমাধ্যমকর্মীদের প্রশ্নের জবাবে তিনি এ কথা বলেন। উপদেষ্টা বলেন, ‘এটা সরকার নজরে নিয়েছে। এটা সরকার খতিয়ে দেখছে। কারণ এটা নিয়ে কিছু কিছু ক্ষেত্রে ভুল বার্তা যাওয়ার সম্ভাবনা আছে গ্লোবালি। এ ব্যাপারে আমরা সচেতন আছি। আমরা এটা নিয়ে ব্যবস্থা নিতে যাচ্ছি এবং আমি ব্যক্তিগতভাবেও এ ব্যাপারে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করেছি। এর পেছনে নিশ্চয়ই কোনো সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা আছে। সেটাই আমরা খতিয়ে দেখছি।


বাংলা গ্লোবাল বুলেটিন

সম্পাদক ও প্রকাশক : এম. আর. আলম
নির্বাহী সম্পাদক : মোঃ মহসিন পারভেজ

কপিরাইট © ২০২৬ বাংলা গ্লোবাল বুলেটিন । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত