সরকারি কর্মচারীদের জন্য আসছে নতুন বেতন কাঠামো। ১১ বছর পর এ উদ্যোগ নিল সরকার। সর্বনিম্ন বেতন ২০ হাজার এবং সর্বোচ্চ ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা করার সুপারিশ করেছে নবম পে কমিশন। সেই সুপারিশ বিবেচনায় নিয়ে নতুন বেতন কাঠামো ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন করা হবে, এমন আভাস দিয়েছে সরকার।
এ উদ্যোগে সরকারি চাকরিজীবীদের মধ্যে স্বস্তি তৈরি হলেও বেসরকারি চাকরিজীবী ও মধ্যবিত্তের একাংশের মধ্যে বাসা ভাড়া, শিক্ষা, পরিবহন ও নিত্যপণ্যের দাম বাড়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে।
সরকারি কর্মচারীদের সর্বশেষ জাতীয় বেতন স্কেল কার্যকর হয়েছিল ২০১৫ সালে। এরপর এক দশকের বেশি সময়ে মূল্যস্ফীতি, বাসা ভাড়া, শিক্ষা, চিকিৎসা ও নিত্যপণ্যের ব্যয় ধারাবাহিকভাবে বেড়েছে।
সরকারের মতে, মূল্যস্ফীতির কারণে প্রকৃত আয় কমে যাওয়ায় নতুন বেতন কাঠামো সময়ের দাবি হয়ে উঠেছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, নতুন অর্থবছরের ১ জুলাই থেকে কার্যকর হতে পারে নবম পে স্কেল। নতুন বেতন কাঠামোতে বর্তমানের ২০টি গ্রেডই বহাল রাখা হয়েছে এবং সব পর্যায়ে মূল বেতন দ্বিগুণ থেকে আড়াই গুণ পর্যন্ত বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। প্রস্তাবিত কাঠামো অনুযায়ী, সর্বনিম্ন গ্রেডের (২০তম গ্রেড) মূল বেতন ৮ হাজার ২৫০ থেকে বাড়িয়ে ২০ হাজার এবং সর্বোচ্চ গ্রেডের (প্রথম গ্রেড) মূল বেতন ৭৮ হাজার থেকে ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা করার সুপারিশ করা হয়েছে। এ পরিবর্তনের ফলে সর্বনিম্ন গ্রেডে বাড়ি ভাড়াসহ অন্যান্য সুবিধা মিলিয়ে মাসিক বেতন ৪১ হাজার ৯০৮ টাকায় দাঁড়াতে পারে। বেতন বৈষম্য কমাতে সর্বনিম্ন ও সর্বোচ্চ গ্রেডের বেতনের অনুপাত ১:৯.০৭৬ থেকে কমিয়ে ১:৮ করা হয়েছে।
নতুন বেতন কাঠামো নিয়ে কথা হয় রাজধানীর একটি সরকারি দপ্তরের ১৩তম গ্রেডের কর্মকর্তা মো. নবীর হোসেনের সঙ্গে। বর্তমান বেতন কাঠামোয় পরিবার চালাতে হিমশিম খাচ্ছেন তিনি। তার মতে, ‘২০১৫ সালের পর থেকে জীবনযাত্রার ব্যয় অনেক বেড়েছে। বাজার, বাসা ভাড়া ও সন্তানদের পড়াশোনার খরচ সামলানো কঠিন হয়ে পড়েছে।’
‘নতুন বেতন কাঠামো অতিরিক্ত সুবিধা নয়; বরং মূল্যস্ফীতির সঙ্গে আয়ের সামঞ্জস্য আনার একটি প্রয়োজনীয় উদ্যোগ’— দাবি নবীর হোসেনের।
নতুন পে স্কেলের খবরে সরকারি চাকরিজীবী নবীর কিছুটা স্বস্তি পেলেও আশঙ্কা কাটছে না বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা খালেদ হাসানের। তার ভাষ্য, সরকারি কর্মচারীদের বেতন বাড়া স্বাভাবিক হলেও এর প্রভাব যদি বাসা ভাড়া ও অন্যান্য ব্যয়ের ওপর পড়ে, তাহলে বেসরকারি চাকরিজীবীদের জন্য পরিস্থিতি আরও কঠিন হবে। কারণ তাদের বেতন একই হারে বাড়বে না।
একই উদ্বেগের কথা জানালেন রাজধানী বাড্ডার বাসিন্দা ও একটি বেসরকারি ব্যাংকের কর্মকর্তা মো. শামীম। জানালেন, গত কয়েক বছরে তার বেতন কিছুটা বাড়লেও বাজার খরচ, সন্তানদের স্কুল ফি, যাতায়াত ও বাসা ভাড়া অনেক বেড়েছে। নতুন করে ব্যয় বাড়লে মধ্যবিত্ত পরিবারের টিকে থাকা আরও কঠিন হয়ে পড়বে।
নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়ন হলে মধ্যবিত্ত পরিবারে প্রভাব পড়বে কি না, জানতে চাওয়া হয়েছিল বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) সাবেক মহাপরিচালক এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ মুস্তফা কে মুজেরির কাছে। আগামীর সময়কে তিনি বললেন, দীর্ঘদিন পর সরকারি কর্মচারীদের বেতন সমন্বয় স্বাভাবিক ও প্রয়োজনীয়। মূল্যস্ফীতির কারণে তাদের প্রকৃত আয় কমেছে। তবে এ সুযোগে কেউ যাতে অযৌক্তিকভাবে বাসা ভাড়া বা পণ্যের দাম না বাড়াতে পারে, সেজন্য প্রয়োজন বাজার তদারকি জোরদার করা।
‘সরকারি কর্মচারীদের বেতন বাড়লেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাসা ভাড়া বাড়বে, এমন কোনো সরাসরি অর্থনৈতিক সম্পর্ক নেই। তবে একটি বড় জনগোষ্ঠীর আয় বাড়ার খবর বাজারে মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব তৈরি করতে পারে। সে সুযোগে কিছু ব্যবসায়ী বা বাড়ির মালিক মূল্য বাড়ানোর চেষ্টা করতে পারেন, যা যৌক্তিক নয়’— উল্লেখ করেন এই অর্থনীতিবিদ।
মুস্তফা কে মুজেরির ভাষ্য, বাড়ি ভাড়া বৃদ্ধির প্রধান কারণ সরকারি বেতন বাড়া নয়। দ্রুত নগরায়ণ, জমির মূল্যবৃদ্ধি, নির্মাণসামগ্রীর দাম, আবাসন সংকট এবং দীর্ঘমেয়াদি মূল্যস্ফীতিই ভাড়ার বাজারে চাপ সৃষ্টি করছে।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের হিসাব অনুযায়ী, নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়নে সরকারের অতিরিক্ত হাজার হাজার কোটি টাকা ব্যয় হবে। সরকারের প্রত্যাশা, এর মাধ্যমে সরকারি কর্মচারীদের জীবনমান উন্নত এবং মূল্যস্ফীতির চাপ মোকাবিলা করা সহজ হবে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, একটি শ্রেণির আয় বাড়া মানেই পুরো সমাজের ক্রয়ক্ষমতা বৃদ্ধি নয়। তাই বেতন বৃদ্ধিকে কেন্দ্র করে যদি অযৌক্তিকভাবে ভাড়া বা বিভিন্ন সেবার মূল্য বাড়ানো হয়, তাহলে এর সবচেয়ে বড় চাপ বহন করতে হবে মধ্যবিত্ত ও বেসরকারি খাতের লাখো মানুষকে।
বিষয় : মূল্যস্ফীতি পে কমিশন

সোমবার, ২৯ জুন ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২৯ জুন ২০২৬
সরকারি কর্মচারীদের জন্য আসছে নতুন বেতন কাঠামো। ১১ বছর পর এ উদ্যোগ নিল সরকার। সর্বনিম্ন বেতন ২০ হাজার এবং সর্বোচ্চ ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা করার সুপারিশ করেছে নবম পে কমিশন। সেই সুপারিশ বিবেচনায় নিয়ে নতুন বেতন কাঠামো ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন করা হবে, এমন আভাস দিয়েছে সরকার।
এ উদ্যোগে সরকারি চাকরিজীবীদের মধ্যে স্বস্তি তৈরি হলেও বেসরকারি চাকরিজীবী ও মধ্যবিত্তের একাংশের মধ্যে বাসা ভাড়া, শিক্ষা, পরিবহন ও নিত্যপণ্যের দাম বাড়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে।
সরকারি কর্মচারীদের সর্বশেষ জাতীয় বেতন স্কেল কার্যকর হয়েছিল ২০১৫ সালে। এরপর এক দশকের বেশি সময়ে মূল্যস্ফীতি, বাসা ভাড়া, শিক্ষা, চিকিৎসা ও নিত্যপণ্যের ব্যয় ধারাবাহিকভাবে বেড়েছে।
সরকারের মতে, মূল্যস্ফীতির কারণে প্রকৃত আয় কমে যাওয়ায় নতুন বেতন কাঠামো সময়ের দাবি হয়ে উঠেছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, নতুন অর্থবছরের ১ জুলাই থেকে কার্যকর হতে পারে নবম পে স্কেল। নতুন বেতন কাঠামোতে বর্তমানের ২০টি গ্রেডই বহাল রাখা হয়েছে এবং সব পর্যায়ে মূল বেতন দ্বিগুণ থেকে আড়াই গুণ পর্যন্ত বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। প্রস্তাবিত কাঠামো অনুযায়ী, সর্বনিম্ন গ্রেডের (২০তম গ্রেড) মূল বেতন ৮ হাজার ২৫০ থেকে বাড়িয়ে ২০ হাজার এবং সর্বোচ্চ গ্রেডের (প্রথম গ্রেড) মূল বেতন ৭৮ হাজার থেকে ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা করার সুপারিশ করা হয়েছে। এ পরিবর্তনের ফলে সর্বনিম্ন গ্রেডে বাড়ি ভাড়াসহ অন্যান্য সুবিধা মিলিয়ে মাসিক বেতন ৪১ হাজার ৯০৮ টাকায় দাঁড়াতে পারে। বেতন বৈষম্য কমাতে সর্বনিম্ন ও সর্বোচ্চ গ্রেডের বেতনের অনুপাত ১:৯.০৭৬ থেকে কমিয়ে ১:৮ করা হয়েছে।
নতুন বেতন কাঠামো নিয়ে কথা হয় রাজধানীর একটি সরকারি দপ্তরের ১৩তম গ্রেডের কর্মকর্তা মো. নবীর হোসেনের সঙ্গে। বর্তমান বেতন কাঠামোয় পরিবার চালাতে হিমশিম খাচ্ছেন তিনি। তার মতে, ‘২০১৫ সালের পর থেকে জীবনযাত্রার ব্যয় অনেক বেড়েছে। বাজার, বাসা ভাড়া ও সন্তানদের পড়াশোনার খরচ সামলানো কঠিন হয়ে পড়েছে।’
‘নতুন বেতন কাঠামো অতিরিক্ত সুবিধা নয়; বরং মূল্যস্ফীতির সঙ্গে আয়ের সামঞ্জস্য আনার একটি প্রয়োজনীয় উদ্যোগ’— দাবি নবীর হোসেনের।
নতুন পে স্কেলের খবরে সরকারি চাকরিজীবী নবীর কিছুটা স্বস্তি পেলেও আশঙ্কা কাটছে না বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা খালেদ হাসানের। তার ভাষ্য, সরকারি কর্মচারীদের বেতন বাড়া স্বাভাবিক হলেও এর প্রভাব যদি বাসা ভাড়া ও অন্যান্য ব্যয়ের ওপর পড়ে, তাহলে বেসরকারি চাকরিজীবীদের জন্য পরিস্থিতি আরও কঠিন হবে। কারণ তাদের বেতন একই হারে বাড়বে না।
একই উদ্বেগের কথা জানালেন রাজধানী বাড্ডার বাসিন্দা ও একটি বেসরকারি ব্যাংকের কর্মকর্তা মো. শামীম। জানালেন, গত কয়েক বছরে তার বেতন কিছুটা বাড়লেও বাজার খরচ, সন্তানদের স্কুল ফি, যাতায়াত ও বাসা ভাড়া অনেক বেড়েছে। নতুন করে ব্যয় বাড়লে মধ্যবিত্ত পরিবারের টিকে থাকা আরও কঠিন হয়ে পড়বে।
নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়ন হলে মধ্যবিত্ত পরিবারে প্রভাব পড়বে কি না, জানতে চাওয়া হয়েছিল বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) সাবেক মহাপরিচালক এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ মুস্তফা কে মুজেরির কাছে। আগামীর সময়কে তিনি বললেন, দীর্ঘদিন পর সরকারি কর্মচারীদের বেতন সমন্বয় স্বাভাবিক ও প্রয়োজনীয়। মূল্যস্ফীতির কারণে তাদের প্রকৃত আয় কমেছে। তবে এ সুযোগে কেউ যাতে অযৌক্তিকভাবে বাসা ভাড়া বা পণ্যের দাম না বাড়াতে পারে, সেজন্য প্রয়োজন বাজার তদারকি জোরদার করা।
‘সরকারি কর্মচারীদের বেতন বাড়লেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাসা ভাড়া বাড়বে, এমন কোনো সরাসরি অর্থনৈতিক সম্পর্ক নেই। তবে একটি বড় জনগোষ্ঠীর আয় বাড়ার খবর বাজারে মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব তৈরি করতে পারে। সে সুযোগে কিছু ব্যবসায়ী বা বাড়ির মালিক মূল্য বাড়ানোর চেষ্টা করতে পারেন, যা যৌক্তিক নয়’— উল্লেখ করেন এই অর্থনীতিবিদ।
মুস্তফা কে মুজেরির ভাষ্য, বাড়ি ভাড়া বৃদ্ধির প্রধান কারণ সরকারি বেতন বাড়া নয়। দ্রুত নগরায়ণ, জমির মূল্যবৃদ্ধি, নির্মাণসামগ্রীর দাম, আবাসন সংকট এবং দীর্ঘমেয়াদি মূল্যস্ফীতিই ভাড়ার বাজারে চাপ সৃষ্টি করছে।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের হিসাব অনুযায়ী, নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়নে সরকারের অতিরিক্ত হাজার হাজার কোটি টাকা ব্যয় হবে। সরকারের প্রত্যাশা, এর মাধ্যমে সরকারি কর্মচারীদের জীবনমান উন্নত এবং মূল্যস্ফীতির চাপ মোকাবিলা করা সহজ হবে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, একটি শ্রেণির আয় বাড়া মানেই পুরো সমাজের ক্রয়ক্ষমতা বৃদ্ধি নয়। তাই বেতন বৃদ্ধিকে কেন্দ্র করে যদি অযৌক্তিকভাবে ভাড়া বা বিভিন্ন সেবার মূল্য বাড়ানো হয়, তাহলে এর সবচেয়ে বড় চাপ বহন করতে হবে মধ্যবিত্ত ও বেসরকারি খাতের লাখো মানুষকে।

আপনার মতামত লিখুন