ঢাকা    সোমবার, ০৮ জুন ২০২৬
বাংলা গ্লোবাল বুলেটিন

আধুনিক সামাজিক বাস্তবতা বিবেচনায় প্রশাসনকে আরও সংবেদনশীল হওয়ার নির্দেশ দিয়েছে আদালত।

বিয়ের আগে পারস্পরিক সম্মতিতে শারীরিক সম্পর্ক চরিত্রের দোষ নয়: ভারতীয় সুপ্রিম কোর্ট



বিয়ের আগে পারস্পরিক সম্মতিতে শারীরিক সম্পর্ক চরিত্রের দোষ নয়: ভারতীয় সুপ্রিম কোর্ট

বিয়ের আগের সম্মতিপূর্ণ প্রেমের সম্পর্ক কোনো ব্যক্তির চরিত্রের দোষ বা কলঙ্ক হিসেবে বিবেচিত হতে পারে না বলে রায় দিয়েছেন ভারতের সুপ্রিম কোর্ট। আদালত বলেছেন, বর্তমান সামাজিক বাস্তবতা ও সময়ের পরিবর্তনের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে প্রশাসনকে আরও সংবেদনশীল হতে হবে। বিচারপতি মনোজ মিশ্র ও বিচারপতি মনমোহনের সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চ এ পর্যবেক্ষণ দেন। ভারতীয় সংবাদমাধ্যম দ্য হিন্দু সোমবার (৮ জুন) এক প্রতিবেদনে এ খবর জানিয়েছে।

আদালত বলেন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীতে নিয়োগের ক্ষেত্রে প্রার্থীর চরিত্র যাচাই অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। তবে আধুনিক সমাজে বিয়ের আগের প্রেমের সম্পর্ক খুবই সাধারণ বিষয় এবং এটিকে কোনো ব্যক্তির চরিত্র নিয়ে নেতিবাচক ধারণা তৈরির কারণ হিসেবে ব্যবহার করা উচিত নয়।

রায়ে বলা হয়, ‘সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বিয়ের আগের সম্পর্কের বিষয়ে কর্তৃপক্ষকে সংবেদনশীল হতে হবে। বর্তমানে এ ধরনের সম্পর্ক খুবই সাধারণ। দুই অবিবাহিত প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তির পারস্পরিক সম্মতিতে গড়ে ওঠা শারীরিক সম্পর্ককে কোনোভাবেই তাদের চরিত্র সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণা তৈরির ভিত্তি হিসেবে ব্যবহার করা যায় না। এমন সম্পর্কের ওপর কোনো আইনি নিষেধাজ্ঞাও নেই।’

এক পুলিশ কনস্টেবল পদপ্রার্থীর চাকরি বাতিলের ঘটনায় করা আপিলের শুনানিতে এ রায় দেন দেশটির সর্বোচ্চ আদালত। তেলেঙ্গানা স্টেট লেভেল পুলিশ রিক্রুটমেন্ট বোর্ড একটি পুরোনো ফৌজদারি মামলার কারণে ওই প্রার্থীকে চাকরির জন্য অনুপযুক্ত ঘোষণা করেছিল।

মামলার তথ্য অনুযায়ী, আবেদনকারী তার চাকরির আবেদনের সময়ই উল্লেখ করেছিলেন যে তার বিরুদ্ধে একটি ফৌজদারি মামলা রয়েছে। অভিযোগকারী এক নারী দাবি করেছিলেন, প্রায় চার বছর ধরে তাদের প্রেমের সম্পর্ক ছিল এবং ওই ব্যক্তি তাকে বিয়ের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। কিন্তু পরে অন্য একজনকে বিয়ে করেন।

এরপর ওই নারী প্রতারণা ও ভয়ভীতি প্রদর্শনের অভিযোগে মামলা করেন। তদন্ত শেষে অভিযোগপত্রও দেওয়া হয়। তবে মামলায় ধর্ষণের কোনো অভিযোগ প্রমাণিত হয়নি। বিচার শুরুর আগেই উভয় পক্ষের সমঝোতার ভিত্তিতে লোক আদালতে বিষয়টির নিষ্পত্তি হয়।

কিন্তু মামলার নিষ্পত্তি এবং প্রার্থীর পূর্ণ তথ্য প্রকাশের পরও নিয়োগ কর্তৃপক্ষ তাকে চাকরির জন্য অনুপযুক্ত ঘোষণা করে। তাদের যুক্তি ছিল, সমঝোতা মানে অপরাধ স্বীকার করা এবং এটিকে সম্পূর্ণ অব্যাহতি হিসেবে ধরা যায় না।

সুপ্রিম কোর্ট এটিকে ‘যুক্তিহীন’ ও ‘বিকৃত ব্যাখ্যা’ বলে উল্লেখ করেন। আদালত বলেন, দীর্ঘমেয়াদি প্রেমের সম্পর্কের ক্ষেত্রে বিয়ের প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের অভিযোগ নিয়ে করা অনেক ফৌজদারি মামলা অতীতেও আদালত খারিজ করেছেন। কারণ এ ধরনের সম্পর্ক সাধারণত পারস্পরিক সম্মতির ভিত্তিতেই গড়ে ওঠে।

আদালত বলেন, ‘সব সম্পর্কই শেষ পর্যন্ত বিয়েতে পরিণত হয় না। তাই কোনো সম্পর্ক বিয়েতে গড়ায়নি বলেই একজন অন্যজনকে প্রতারণা করেছে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না।’

রায়ে আরও বলা হয়, ফৌজদারি আইনের মৌলিক নীতি হলো আদালতে অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত অভিযুক্ত ব্যক্তি নির্দোষ হিসেবে বিবেচিত হবেন। এছাড়া অভিযোগকারী নিজেই যখন মামলা চালিয়ে যেতে অনিচ্ছা প্রকাশ করে সমঝোতায় সম্মতি দিয়েছেন, তখন নিয়োগ কর্তৃপক্ষের পক্ষে ঘটনার আড়ালে অন্য অর্থ খুঁজে প্রার্থীর চরিত্র নিয়ে নেতিবাচক ধারণা তৈরি করা সমীচীন নয়।

তবে আদালত এটাও স্পষ্ট করেছেন যে নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান কোনো প্রার্থীর বিরুদ্ধে থাকা অপরাধমূলক অতীত খতিয়ে দেখতে পারে। কিন্তু সেই ভিত্তিতে নেতিবাচক সিদ্ধান্ত নিতে হলে অপরাধ সংঘটন এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির সম্পৃক্ততার বিষয়ে বস্তুনিষ্ঠ ও গ্রহণযোগ্য প্রমাণ থাকতে হবে।

সবশেষে সুপ্রিম কোর্ট পুলিশ কনস্টেবল পদপ্রার্থীর আপিল মঞ্জুর করে তার নিয়োগের নির্দেশ বহাল রাখেন এবং বিপরীতমুখী রায় বাতিল করেন।

আপনার মতামত লিখুন

বাংলা গ্লোবাল বুলেটিন

সোমবার, ০৮ জুন ২০২৬


বিয়ের আগে পারস্পরিক সম্মতিতে শারীরিক সম্পর্ক চরিত্রের দোষ নয়: ভারতীয় সুপ্রিম কোর্ট

প্রকাশের তারিখ : ০৮ জুন ২০২৬

featured Image

বিয়ের আগের সম্মতিপূর্ণ প্রেমের সম্পর্ক কোনো ব্যক্তির চরিত্রের দোষ বা কলঙ্ক হিসেবে বিবেচিত হতে পারে না বলে রায় দিয়েছেন ভারতের সুপ্রিম কোর্ট। আদালত বলেছেন, বর্তমান সামাজিক বাস্তবতা ও সময়ের পরিবর্তনের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে প্রশাসনকে আরও সংবেদনশীল হতে হবে। বিচারপতি মনোজ মিশ্র ও বিচারপতি মনমোহনের সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চ এ পর্যবেক্ষণ দেন। ভারতীয় সংবাদমাধ্যম দ্য হিন্দু সোমবার (৮ জুন) এক প্রতিবেদনে এ খবর জানিয়েছে।

আদালত বলেন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীতে নিয়োগের ক্ষেত্রে প্রার্থীর চরিত্র যাচাই অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। তবে আধুনিক সমাজে বিয়ের আগের প্রেমের সম্পর্ক খুবই সাধারণ বিষয় এবং এটিকে কোনো ব্যক্তির চরিত্র নিয়ে নেতিবাচক ধারণা তৈরির কারণ হিসেবে ব্যবহার করা উচিত নয়।

রায়ে বলা হয়, ‘সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বিয়ের আগের সম্পর্কের বিষয়ে কর্তৃপক্ষকে সংবেদনশীল হতে হবে। বর্তমানে এ ধরনের সম্পর্ক খুবই সাধারণ। দুই অবিবাহিত প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তির পারস্পরিক সম্মতিতে গড়ে ওঠা শারীরিক সম্পর্ককে কোনোভাবেই তাদের চরিত্র সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণা তৈরির ভিত্তি হিসেবে ব্যবহার করা যায় না। এমন সম্পর্কের ওপর কোনো আইনি নিষেধাজ্ঞাও নেই।’

এক পুলিশ কনস্টেবল পদপ্রার্থীর চাকরি বাতিলের ঘটনায় করা আপিলের শুনানিতে এ রায় দেন দেশটির সর্বোচ্চ আদালত। তেলেঙ্গানা স্টেট লেভেল পুলিশ রিক্রুটমেন্ট বোর্ড একটি পুরোনো ফৌজদারি মামলার কারণে ওই প্রার্থীকে চাকরির জন্য অনুপযুক্ত ঘোষণা করেছিল।

মামলার তথ্য অনুযায়ী, আবেদনকারী তার চাকরির আবেদনের সময়ই উল্লেখ করেছিলেন যে তার বিরুদ্ধে একটি ফৌজদারি মামলা রয়েছে। অভিযোগকারী এক নারী দাবি করেছিলেন, প্রায় চার বছর ধরে তাদের প্রেমের সম্পর্ক ছিল এবং ওই ব্যক্তি তাকে বিয়ের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। কিন্তু পরে অন্য একজনকে বিয়ে করেন।

এরপর ওই নারী প্রতারণা ও ভয়ভীতি প্রদর্শনের অভিযোগে মামলা করেন। তদন্ত শেষে অভিযোগপত্রও দেওয়া হয়। তবে মামলায় ধর্ষণের কোনো অভিযোগ প্রমাণিত হয়নি। বিচার শুরুর আগেই উভয় পক্ষের সমঝোতার ভিত্তিতে লোক আদালতে বিষয়টির নিষ্পত্তি হয়।

কিন্তু মামলার নিষ্পত্তি এবং প্রার্থীর পূর্ণ তথ্য প্রকাশের পরও নিয়োগ কর্তৃপক্ষ তাকে চাকরির জন্য অনুপযুক্ত ঘোষণা করে। তাদের যুক্তি ছিল, সমঝোতা মানে অপরাধ স্বীকার করা এবং এটিকে সম্পূর্ণ অব্যাহতি হিসেবে ধরা যায় না।

সুপ্রিম কোর্ট এটিকে ‘যুক্তিহীন’ ও ‘বিকৃত ব্যাখ্যা’ বলে উল্লেখ করেন। আদালত বলেন, দীর্ঘমেয়াদি প্রেমের সম্পর্কের ক্ষেত্রে বিয়ের প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের অভিযোগ নিয়ে করা অনেক ফৌজদারি মামলা অতীতেও আদালত খারিজ করেছেন। কারণ এ ধরনের সম্পর্ক সাধারণত পারস্পরিক সম্মতির ভিত্তিতেই গড়ে ওঠে।

আদালত বলেন, ‘সব সম্পর্কই শেষ পর্যন্ত বিয়েতে পরিণত হয় না। তাই কোনো সম্পর্ক বিয়েতে গড়ায়নি বলেই একজন অন্যজনকে প্রতারণা করেছে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না।’

রায়ে আরও বলা হয়, ফৌজদারি আইনের মৌলিক নীতি হলো আদালতে অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত অভিযুক্ত ব্যক্তি নির্দোষ হিসেবে বিবেচিত হবেন। এছাড়া অভিযোগকারী নিজেই যখন মামলা চালিয়ে যেতে অনিচ্ছা প্রকাশ করে সমঝোতায় সম্মতি দিয়েছেন, তখন নিয়োগ কর্তৃপক্ষের পক্ষে ঘটনার আড়ালে অন্য অর্থ খুঁজে প্রার্থীর চরিত্র নিয়ে নেতিবাচক ধারণা তৈরি করা সমীচীন নয়।

তবে আদালত এটাও স্পষ্ট করেছেন যে নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান কোনো প্রার্থীর বিরুদ্ধে থাকা অপরাধমূলক অতীত খতিয়ে দেখতে পারে। কিন্তু সেই ভিত্তিতে নেতিবাচক সিদ্ধান্ত নিতে হলে অপরাধ সংঘটন এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির সম্পৃক্ততার বিষয়ে বস্তুনিষ্ঠ ও গ্রহণযোগ্য প্রমাণ থাকতে হবে।

সবশেষে সুপ্রিম কোর্ট পুলিশ কনস্টেবল পদপ্রার্থীর আপিল মঞ্জুর করে তার নিয়োগের নির্দেশ বহাল রাখেন এবং বিপরীতমুখী রায় বাতিল করেন।


বাংলা গ্লোবাল বুলেটিন

সম্পাদক ও প্রকাশক : এম. আর. আলম
নির্বাহী সম্পাদক : মোঃ মহসিন পারভেজ

কপিরাইট © ২০২৬ বাংলা গ্লোবাল বুলেটিন । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত