মাওলানা আজিজুল হক ইসলামাবাদী হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের যুগ্ম মহাসচিব। দায়িত্ব পালন করছেন রাজধানীর মাদ্রাসাতুল আতহার আল ইসলামিয়ার প্রিন্সিপাল হিসেবে। হেফাজতে ইসলামের রাজনীতি, সাম্প্রতিক সময়ে সংগঠনের নিষ্ক্রিয়তা, শাপলা চত্বরের শহীদদের তালিকা প্রকাশে দীর্ঘসূত্রতা, সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ‘কওমি জননী’ উপাধি এবং কওমি সনদের স্বীকৃতিসহ নানা বিষয়ে এশিয়া পোস্টের সঙ্গে কথা বলেছেন। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন রায়হান রাশেদ
এশিয়া পোস্টের সাক্ষাৎকারটি হুবুহু বাংলা গ্লোবাল বুলেটিনের পাঠকদের জন্য নিচে দেয়া হলো।
এশিয়া পোস্ট: হেফাজতে ইসলাম দাবি করে, এটি অরাজনৈতিক সংগঠন। কিন্তু এর দায়িত্বশীল অনেকেই কোনো না কোনো রাজনৈতিক দলের নেতা। রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত হয়ে সংগঠনের কর্মসূচি নেওয়া সম্ভব হয়?
আজিজুল হক: আল্লামা শাহ আহমদ শফি (রহ.) ও আল্লামা জুনায়েদ বাবুনগরীসহ (রহ.) দেশের শীর্ষ আলেমদের নেতৃত্বে একটি বৃহৎ লক্ষ্যকে সামনে রেখে হেফাজতে ইসলাম অরাজনৈতিকভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এ সংগঠন অরাজনৈতিক ছিল, আছে এবং থাকবে। রাজনৈতিক নেতারা এখানে যুক্ত আছেন দেশের একজন আলেম হিসেবে। একজন নাগরিক মন্ত্রিত্বের দায়িত্ব পালনের সঙ্গে সঙ্গে দলেরও দায়িত্ব যেমন পালন করেন, হেফাজতের নেতারও তেমন।
ইসলামের মৌলিক বিষয়ে ইসলামবিদ্বেষী শক্তি ষড়যন্ত্র বা চক্রান্ত করলে রাজনৈতিক-অরাজনৈতিক সব আলেমের দায়িত্ব এর প্রতিবাদ ও প্রতিরোধ করা। এই জায়গা থেকে হেফাজতের সঙ্গে যেসব রাজনৈতিক নেতা আছেন, তারা রাজনৈতিক পরিচয়ে হেফাজতে আসেন না, তারা আলেম হিসেবে আসেন। দায়িত্ব পালন করেন। রাজনৈতিক প্রভাবে হেফাজত কর্মসূচি বাস্তবায়ন করে না। রাজনৈতিক নেতাদের দ্বারা হেফাজত প্রভাবিত নয়।
এশিয়া পোস্ট: আল্লামা শাহ আহমদ শফি (রহ.) ও আল্লামা জুনায়েদ বাবুনগরী (রহ.) সংগঠনটির আমির থাকাকালে যে প্রভাব-প্রতিপত্তি ছিল, এখন নেই কেন?
আজিজুল হক: তারা দুজনই দেশের বিখ্যাত আলেম। আল্লামা আহমদ শফি (রহ.) দারুল উলুম দেওবন্দ থেকে পড়াশোনা শেষে চট্টগ্রামের মঈনুল ইসলাম হাটহাজারী মাদ্রাসায় শিক্ষকতা শুরু করেন। অত্যন্ত সুনামের সঙ্গে শিক্ষকতা ও পরে মাদ্রাসা পরিচালনা করেছেন তিনি। দেশে তার লাখো ছাত্র ও অনুসারী আছে। আল্লামা জুনায়েদ বাবুনগরীও (রহ.) বিখ্যাত আলেম ও মুহাদ্দিস। তার বাবাও বড় আলেম। দেশে বাবা-ছেলের লাখো ছাত্র ও অনুসারী ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে। এ দুজনের নেতৃত্বে হেফাজতে ইসলাম প্রতিষ্ঠিত হলে দেশের আলেম ও ধর্মপ্রাণ মুসলিমরা পঙ্গপালের মতো হেফাজতের ব্যানারে ছুটে এসেছে। ঐক্যবদ্ধ হয়েছে। কাজ করেছে। বর্তমান আমির আল্লামা মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরী (দা. বা.)—তিনিও বিখ্যাত আলেম। এ দেশে হাদিস ও আধ্যাত্মিক চর্চায় তার পরিবারের অনেক অবদান রয়েছে। স্বীকার করতে অসুবিধে নেই, আল্লামা আহমদ শফি (রহ.) ও আল্লামা জুনায়েদ বাবুনগরীর (রহ.) যে পরিচিতি, সেটা আল্লামা মুহিববুল্লাহ বাবুনগরীর নেই। তবে দেশের আলেম ও জনগণের কাছে তার ব্যাপক গ্রহণযোগ্যতা ও অবস্থান রয়েছে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট স্বৈরশাসক শেখ হাসিনার পতনের পর তার নেতৃত্বে ৬৪ জেলায় হেফাজতকে সাংগঠনিকভাবে শক্তিশালী করেছি।
আল্লামা আহমদ শফি (রহ.) ও আল্লামা জুনায়েদ বাবুনগরীর (রহ.) সময় হেফাজত যেমন শক্ত অবস্থানে ছিল, এখনও হেফাজত তার সাংগঠনিক শক্তি নিয়ে শক্ত অবস্থানে প্রতিষ্ঠিত আছে। এর প্রমাণ আমরা ২০২৫ সালের ৩ মে রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে মহাসমাবেশ করে জাতিকে জানিয়ে দিয়েছি।
এশিয়া পোস্ট: ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর হেফাজতকে কিছুটা নিষ্ক্রিয় মনে হচ্ছে। কোনো চাপ আছে?
আজিজুল হক: হেফাজতে ইসলাম নিষ্ক্রিয় নয়। হেফাজত ইস্যুভিত্তিক কর্মকাণ্ডে কর্মসূচি বাস্তবায়ন করে। প্রথমত, হেফাজত কওমি আলেমদের সংগঠন, শাবান মাসের শুরুতে মাদ্রাসার পরীক্ষার কারণে কর্মসূচি নিতে পারিনি। দ্বিতীয়ত, নির্বাচন হয়েছে রমজানের আগমুহূর্তে। রমজানে কর্মসূচি পালন সম্ভব নয়। রমজান গেল। এখন মাদ্রাসাগুলো খুললে কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির মিটিং আহ্বান করে পরবর্তী কর্মসূচি নেব। হেফাজত নিষ্ক্রিয় নয়, সমসাময়িক পরিস্থিতির কারণে তেমন দৃশ্যমান তৎপরতা ছিল না।
এশিয়া পোস্ট: নির্বাচনের আগে হেফাজতের আমির মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরী প্রকাশ্যে চট্টগ্রাম-২ (ফটিকছড়ি উপজেলা) আসনের বিএনপি মনোনীত প্রার্থীর পক্ষে ভোট চেয়েছেন। নির্বাচনে ইসলামপন্থি দলও ছিল। তাদের সমর্থন না দিয়ে বিএনপিকে দেওয়ার কারণ কী?
আজিজুল হক: আল্লামা মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরী (রহ.) ২০২৫ সালের শুরু থেকে—বিশেষ করে কওমি ঘরনার ইসলামি দলগুলোকে ঐক্যবদ্ধ করতে চেষ্টা করেছিলেন। একাধিকবার মিটিং ডেকে ছিলেন। গত বছরের রমজানের আগেও তিনি দেশের শীর্ষ ইসলামি রাজনৈতিক দলগুলোকে ঐক্যবদ্ধ করতে মিটিং ডেকে ছিলেন। রমজানের পর ২০২৫ সালের ১২ এপ্রিল আরেকটি মিটিং ডেকে ছিলেন। সেটিও সফল হয়নি। তিনি ঐক্যের যে স্বপ্ন দেখেছিলেন, তা বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি।
ইসলামি জোটের যে প্রধান দল—জামায়াতে ইসলামী—এর প্রতিষ্ঠাতা মরহুম মাওলানা আবু আলা মওদুদীর কয়েকটি বিতর্কিত বিষয়কে হেফাজত আমির কঠিনভাবে নিয়েছেন, যা মুসলমানদের ইমান-আকিদার প্রশ্নে আপসহীন। মওদুদী সাহেব নবী ও সাহাবিদের বিষয়ে যে কথা বলেছেন, এটা ইমান ও আকিদার সঙ্গে সাংঘর্ষিক। হেফাজত আমিরের বক্তব্য হলো, ইমান বাঁচাতে হলে আকিদা সঠিক করতে হবে। আকিদা সঠিক না হলে ভুল আকিদার ভিত্তিতে ইসলাম প্রতিষ্ঠা হবে। আমিসহ আলেমরা তার কাছে জানতে চাইলাম, ‘জামায়াতে ইসলামের নামে রাজনীতি করছে—তারা ইসলামি জোট করেছে। বিএনপি ইসলামি দল বা জোট নয়? আপনি ইসলামি জোটের পক্ষে না থেকে বিএনপির পক্ষে কেন?’ তিনি বললেন, ‘মসজিদের দাঁড়িওয়ালা ইমাম সুন্নতি পোশাক পরে তোমার বাবাকে গালি দিলে মানবে?’ বললাম, ‘না।’ বললেন, ‘মুসল্লিরা দাঁড়িও রাখে না, সুন্নতি পোশাকও পরে না, কিন্তু তোমার বাবাকে গালি দেয় না। কাকে ভালো বলবে, কার পক্ষে অবস্থান নেবে?’ আমরা বিষয়টি বুঝলাম। জামায়াতে ইসলামের পোশাক পরে নবীদের নামে অন্যায় কথা বলা এবং সাহাবিদের সত্যের মাপকাঠি না মানা নিয়ে হেফাজত আমির যে যুক্তি দিয়েছেন, এ যুক্তিতে দেশের আলেমরা ঐক্যবদ্ধ। এ কারণে দেশের আলেমদের বড় একটা অংশ বিএনপির পক্ষ নিয়েছেন। নাগরিক হিসেবে ভোট দেওয়ার অধিকার সবার আছে। প্রত্যেকে তার পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দিয়েছেন।
এশিয়া পোস্ট: নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামী ছাড়া আরও ইসলামপন্থি দল ছিল, তাদের আকিদা সঠিক। কিন্তু হেফাজত আমির তাদের পক্ষ নেননি।
আজিজুল হক: ফটিকছড়িতে বিএনপির বিপরীতে দাঁড়িপাল্লার প্রার্থী ছিল। সেখানে ইসলামপন্থি দলের প্রার্থী ছিল না। তাই হেফাজত আমির তার যুক্তি ও দর্শনের আলোকে বিএনপির প্রার্থীকে সমর্থন দিয়েছেন।
এশিয়া পোস্ট: দেশের অন্যান্য জায়গায় ইসলামপন্থি দলের প্রার্থীরা ছিলেন। তাদের বিষয়ে হেফাজত আমিরের অবস্থান কী ছিল?
আজিজুল হক: যেখানে ইসলামি দলগুলোর প্রার্থী ছিল, আলেমরা তাদের পক্ষে কাজ করেছেন। পছন্দীয় প্রার্থীকে ভোট দেওয়া মানুষের নাগরিক ও সাংবিধানিক অধিকার। এ ক্ষেত্রে হেফাজত আমির তার অবস্থান পরিষ্কার করেছেন।
এশিয়া পোস্ট: আপনি বলেছেন, হেফাজত আমির ইসলামপন্থি দলগুলো নিয়ে ঐক্য করতে একাধিক মিটিং করেছিলেন। কিন্তু ঐক্য করা সম্ভব হয়নি। কেন?
আজিজুল হক: নানাবিধ কারণ আছে। রাজনৈতিক নেতাদের পারস্পরিক বোঝাপড়া, নিজেদের ভবিষ্যৎ চিন্তা ও লাভ-লোকসানের হিসাব ছিল। বিশেষ করে সবারই তো নিজস্ব রাজনৈতিক দর্শন আছে, হয়তো দর্শনের কারণে হেফাজত আমিরের সঙ্গে তাদের মিল হয়নি।
এশিয়া পোস্ট: ২০১৩ সালের ৫ মে মধ্যরাতে রাজধানীর শাপলা চত্বরে হেফাজতের ৯৩ কর্মী শহীদ হয়েছেন বলে গত বছরের ৪ মে আপনারা তালিকা প্রকাশ করেছেন। তালিকা প্রকাশ করতে আপনাদের ১২ বছর লাগল কেন?
আজিজুল হক: ২০১৩ সালের ৫ মে শাপলা চত্বরের ঘটনার পর আওয়ামী ফ্যাসিবাদী জালেমগোষ্ঠী আলেমদের ওপর যে পরিমাণ নির্যাতন করেছে, এটা বর্ণনাতীত। দেশের পুলিশ, র্যাব ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা সরকারের তল্পিবাহক হয়ে সরকারের লাঠিয়াল বাহিনীর পরিচয় দিয়ে ভয়ংকরভাবে শহীদ ও তার পরিবারের ওপর অত্যাচার করেছে। শাপলা চত্বরে শহীদদের অনেকের জানাজা পড়তে দেয়নি। জানাজা পড়তে মাঠে অনুমতি দেয়নি। মাদ্রাসা শিক্ষকের জানাজা তার মাদ্রাসায় পড়তে দেয়নি। শেষ পর্যন্ত এলাকার লোকেরা দা-বঁটি নিয়ে পুলিশকে ধাওয়া দিয়ে ধানক্ষেতে তার জানাজা পড়েছেন। মরদেহ বাড়ি যাওয়ার আগে বাড়ি র্যাব-পুলিশ ঘেরাও করে রেখেছে। পরিবারের মাত্র চার সদস্য জানাজা পড়িয়ে তাকে দাফন করেছে।
তালিকা করতে তদন্ত কমিটি গঠন করলে আমাদের তুলে নেওয়া হয়েছে। হুমকি-ধমকি দেওয়া হয়েছে। হেফাজতের শহীদদের তালিকা যেন না হয়, তাদের কথা যেন জাতি জানতে না পারে, তাদের যেন ইতিহাস থেকে মুছে দেওয়া হয়, এমনকি হেফাজতের শহীদদের অস্বীকার করতে আওয়ামী ফ্যাসিবাদী সরকার পদক্ষেপ গ্রহণ করেছেন। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী করেছে। এমনকি একজনও শহীদ হয়নি বলে তারা ঘোষণা করেছে। আমাদের শতভাগ চেষ্টা থাকা সত্ত্বেও সরকারের চাপের কারণে তালিকা করতে পারিনি। ৫ আগস্টের পর প্রকাশ করেছি।
এশিয়া পোস্ট: হেফাজতের শহীদদের তালিকা করার কারণে মানবাধিকার সংগঠন অধিকারের তৎকালীন সম্পাদক আদিলুর রহমান খান (পরে অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা) ও পরিচালক এএসএম নাসির উদ্দিন এলানের জেল হয়েছে। তারা করতে পেরেছিলেন, কিন্তু দেশব্যাপী হেফাজতের এত নেতাকর্মী থাকার পরও আপনারা পারেননি কেন?
আজিজুল হক: অধিকার একটা আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা। তালিকা করার কারণে অধিকারের আদিল ভাই ও এলান ভাইকে সরকার গ্রেপ্তার করে সাজা দিয়েছে। তালিকা করার কারণে একটা আন্তর্জাতিক সংস্থাকে যদি তারা সাজা দিতে পারে, হেফাজতের দায়িত্বশীলদের তো আন্তর্জাতিক লবিং নেই। আমরা দেশের নিরীহ আলেমসমাজ। পেশিবাদী শক্তিকে মোকাবিলার শক্তি ও সাহস নেই আমাদের। শহীদদের পক্ষে কথা বলার কারণে আমাদের বিরুদ্ধে প্রায় সাড়ে তিনশর মতো মামলা দেওয়া হয়েছে। এই মামলায় হাজার হাজার মানুষ গ্রেপ্তার হয়েছেন। সরকারের চাপের কারণে তালিকা করতে পারেনি।
এশিয়া পোস্ট: শুধু কী ৯৩ জনই শহীদ হয়েছেন?
আজিজুল হক: ৯৩ জন নয়, আরও বেশি হবে। অনেক পরিবার এখনো শহীদদের কথা বলতে চান না ভয়ে। যদি আওয়ামী লীগ ফিরে আসে। যদি তাদের ওপর আবার অত্যাচার করা হয়।
মিডিয়ায় এসেছে, ১৩ সালের ৫ তারিখে জুরাইন কবরে অনেক বেওয়ারিশ লাশ দাফন করা হয়েছে। যাত্রাবাড়ীর ময়লার স্তূপে মানুষের হাড় পাওয়া গেছে। বিভিন্ন মিডিয়া, মানবধিকার সংস্থা ও গোয়েন্দা সংস্থা বলেছে, এগুলো হেফাজতের লাশ। বিশেষ করে আঞ্জুমান মুফিদুল ইসলাম ১৩ সালের মে মাসে প্রায় পাঁচশ বেওয়ারিশ লাশ দাফন করেছে। এগুলো তো দাফন হয়ে গেছে। পরিবারও জানে না, এগুলো কার লাশ। আমরা চেষ্টা করছি, তালিকা আরও সমৃদ্ধি করতে।
এশিয়া পোস্ট: কতজন শহীদ হয়েছেন বলে মনে করেন?
আজিজুল হক: শহীদদের তালিকা দীর্ঘ হবে। এর সঠিক হিসাব নির্ণয় করে বলা সম্ভব নয়।
এশিয়া পোস্ট: অভিযোগ আছে, শাপলা চত্বরে শহীদদের জন্য বিগত ১২ বছর বিচার চায়নি হেফাজতে ইসলাম। শহীদদের পরিবারের পাশেও দাঁড়ায়নি। এর কারণ কী?
আজিজুল হক: কেউ যদি বলে, হেফাজত শহীদদের পাশে দাঁড়ায়নি—অত্যন্ত ভুল হবে। হেফাজত তার শক্তি ও সামর্থ্য অনুযায়ী ২০১৩ সালেই শহীদ পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করেছে। বিভিন্ন জেলায় টিম গিয়ে সহযোগিতা করেছে। প্রত্যেক পরিবার কমবেশি হেফাজতের সহযোগিতা পেয়েছে। কোনো পরিবারকে একাধিকবার সহযোগিতা করা হয়েছে। কাউকে ঘর দেওয়া হয়েছে। কারও মেয়ের বিয়ের ব্যবস্থা করা হয়েছে। একজন শহীদের নামে মাদ্রাসা করা হয়েছে। তাদের সহযোগিতা করেনি, এটা মিথ্যা প্রচারণা।
এশিয়া পোস্ট: ১২ বছর বিচার চেয়েছিলেন?
আজিজুল হক: আমরা শতবার সংবাদ সম্মেলন ও মিছিল করে বিচার চেয়েছি। আওয়ামী ফ্যাসিবাদি সরকার—যারা শহীদ করেছে, তারা কি শহীদদের বিচার করবে? জালেমরা তো করবে না। অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের পরপরই আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনালে হেফাজতের পক্ষে আমি বাদী হয়ে অভিযোগ করেছি। এই মামলায় সরকারের শীর্ষ কর্মকর্তা, মন্ত্রী-এমপিরা জেলে আছেন। বিচার কার্যক্রম শুরু হয়েছে। সাক্ষী সংগ্রহ করা হয়েছে। বিশ্বাস করি, শাপলা চত্বরে হত্যাকাণ্ডের বিচারের মুখোমুখি জালেমদের করতে পারব।
এশিয়া পোস্ট: যে আওয়ামী লীগ সরকার হেফাজত কর্মীদের শহীদ করল, সে সরকারের প্রধান শেখ হাসিনাকে আপনারা শোকরানা মাহফিল করে সম্মাননা দিলেন। অথচ তখনও হেফাজতের শহীদদের তালিকা করা যায়নি, বিচারও হয়নি। এটা কী হেফাজতের শহীদদের রক্তের সঙ্গে প্রতারণা নয়?
আজিজুল হক: এ বিষয়ে একটা ভুল বার্তা জাতির কাছে আছে। হেফাজত একটা আলাদা সংগঠন, কওমি মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ড আলাদা প্রতিষ্ঠান। শিক্ষা বোর্ডের সঙ্গে সরকারের যোগাযোগ থাকাটা স্বাভাবিক। শাপলা চত্বরে যারা গণহত্যা চালিয়েছে, তাদের সঙ্গে হেফাজতের সম্পর্ক থাকতে পারে না। আল্লামা আহমদ শফি তখন হেফাজতের আমির, আবার কওমি মাদ্রাসার সর্বোচ্চ শিক্ষা বোর্ড আল-হাইয়াতুল উলয়ারও চেয়ারম্যান। শাপলা চত্বরের হত্যাকাণ্ডকে মুছে দেওয়া ও আলেমদের নিয়ন্ত্রণের কুমতলবে সরকার দাওরায়ে হাদিসকে মাস্টার্সের সমমান স্বীকৃতি দিয়েছে। স্বীকৃতির দাবি হেফাজতের ছিল না, এটা কওমি মাদ্রাসা বোর্ডের দাবি ছিল। সরকার স্বীকৃতি দিয়ে একটা রাজনৈতিক ডিগবাজি খেলেছে। এই স্বীকৃতি একটা কলাপাতা, কোনো মূল্য নেই। স্বীকৃতি দিয়ে ছাত্ররা কিছু করতে পারে না—এটা ধোঁকাবাজি। রাজনৈতিক প্রতারণার আশ্রয় নিতে দেওয়া হয়েছে।
শোকরানা মাহফিলের আয়োজক ছিল সরকার। সে মাহফিলে খুনি হাসিনার সামরিক সচিব মিয়া মো. জয়নাল আবেদিন দাঁড়িয়ে শাপলা চত্বরের গণহত্যাকে অস্বীকার করলেন। হেফাজতের পক্ষ থেকে আল্লামা জুনায়েদ বাবুনগরী—তিনি তখন মহাসচিব—তিনি শোকরানা মাহফিলে অংশ নেননি, সাংগঠনিক সম্পাদক হিসেবে আমিও অংশ নিইনি, বর্তমান আমির আল্লামা মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরী অংশ নেননি, আরও অনেক আলেম উপস্থিত হননি—আমরা শক্ত প্রতিবাদ করে তার বক্তব্য প্রত্যাখ্যান করেছিলাম। শোকরানা মাহফিলে হেফাজতের কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই। আহমদ শফি বোর্ডের চেয়ারম্যান হিসেবে সেখানে উপস্থিত হয়েছিলেন, হেফাজতের আমির হিসেবে নন।
এশিয়া পোস্ট: আপনি বললেন, সনদ দিয়ে ডিগবাজি খেলা হয়েছে এবং শহীদদের রক্তকে মুছে দিতে দেওয়া হয়েছে। এসব জেনেও কেন স্বীকৃতি নিলেন?
আজিজুল হক: এটা একান্ত আমার মতামত। সরকারের এই কূটচাল বোঝা সহজ-সরল আলেমদের পক্ষে সম্ভব নয়। তারা এটা করে প্রতিবাদী শক্তিশালী আলেমসমাজকে দমিয়ে রাখার ষড়যন্ত্র করেছে।
এশিয়া পোস্ট: ২০১৮ সালের ৪ নভেম্বর রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে আল-হাইআতুল উলয়া লিল-জামিয়াতিল কওমিয়া বাংলাদেশ আয়োজিত শোকরানা মাহফিলে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ‘কওমি জননী’ উপাধিতে ভূষিত করা হয়। সেখানে আহমদ শফি (রহ.) থেকে শুরু করে হেফাজতের প্রায় সব বড় নেতারা ছিলেন। আপনারা কী তাকে ‘কওমি জননী’ হিসেবে স্বীকৃতি দেন?
আজিজুল হক: হেফাজতের নেতাদের ওপর যে আওয়ামী লীগ গণহত্যা চালাল, সে সরকারের প্রধান শেখ হাসিনাকে হেফাজতের পক্ষ থেকে কওমি জননী উপাধি দেওয়া অবাস্তব কথা। হেফাজত তাকে কওমি জননী উপাধি দেয়নি। গওহরডাঙ্গা বোর্ডের চেয়ারম্যান মাওলানা রুহুল আমিন, তার বাড়ি গোপালগঞ্জ। তিনি শেখ হাসিনার গৃহপালিত ব্যক্তি। তিনি গৃহপালিত বায়তুল মোকাররমের খতিব ছিলেন। তিনি তার রাজনৈতিক স্বার্থ হাসিলের জন্য শেখ হাসিনাকে কওমি জননী উপাধি দিয়েছেন। হেফাজত বা হেফাজতের নেতা দেয়নি। তার সঙ্গে হেফাজতের সম্পর্ক নেই, তার সঙ্গে শেখ হাসিনার সম্পর্ক। তিনি হাসিনাকে তুষ্ট করতে এ উপাধি দিয়েছেন।
এশিয়া পোস্ট: কিন্তু ওই মঞ্চে তো হেফাজত নেতারা বা বোর্ড এর প্রতিবাদ করেনি। পরে সংবাদ সম্মেলন করে কি হেফাজত বলেছিল বা কওমি মাদ্রাসার পক্ষে আপনারা বলেছিলেন, আমরা তাকে কওমি জননী উপাধি দেইনি, এটা মাওলানা রুহুল আমিনের ব্যক্তিগত ব্যাপার।
আজিজুল হক: উপস্থিতরা কেন প্রতিবাদ করেননি, তাদের ব্যাপার। জুনায়েদ বাবুনগরী (রহ.)-এর পক্ষে আমি বিবৃতি দিয়ে সেটা প্রত্যাখ্যান করেছি। এ উপাধি হেফাজত দেয়নি, জাতিকে জানিয়েছি আমরা।
এশিয়া পোস্ট: কওমি সনদের স্বীকৃতি দিয়ে সরকারি চাকরিতে আবেদন করা যায় না। বেসরকারি চাকরিতেও এর গুরুত্ব নেই। কওমি শিক্ষার্থীদের মধ্যে এ নিয়ে চরম অসন্তুষ্টি আছে। স্বীকৃতিতে আসলে কী লাভ হলো?
আজিজুল হক: আমি একটু আগে বলেছি, রাজনৈতিক প্রতারণার আশ্রয় নিয়ে সরকার কওমি আলেমদের চোখে ধুলা দিয়েছে। যে স্বীকৃতি দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষায় অংশ নিতে পারব না, সরকারি চাকরি পাব না, বিসিএস পরীক্ষা দিতে পারব না, বিদেশি চাকরি নিতে পারব না, তাহলে এটা দিয়ে কি লাভ! আমি মনে করি, কওমি মাদ্রাসার তরুণ আলেমদের কাছে টানতে তারা এই প্রতরণা করেছে। সেটা বুমেরাং হয়েছে।
এশিয়া পোস্ট: সনদের স্বীকৃতি নিয়ে নতুন করে কিছু ভাবছেন?
আজিজুল হক: হেফাজতের পক্ষে অন্তর্বর্তী সরকারের কাছে আবেদন করেছিলাম, দেশের ৬৫ হাজার প্রাইমারি স্কুলের ধর্মীয় শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে এ সনদকে স্বীকৃতি দিতে। দাওরায়ে হাদিস পাস শিক্ষার্থীদের জন্য ধর্মীয় শিক্ষকের পদ সৃষ্টি করতে। একটা প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। এ বিষয়ে হেফাজত ও আল-হাইয়াতুল উলয়ার নেতারা তৎকালীন ধর্ম উপদেষ্টা আ ফ ম খালিদ হোসেন, উপদেষ্টা আদিলুর রহমান খানসহ শিক্ষা উপদেষ্টার সঙ্গে একাধিক বৈঠক করেছেন। এই সরকারের শিক্ষামন্ত্রীর সঙ্গে এ বিষয়ে আলাপ করেছি। তিনি সংসদে আলোচনা করেছেন।
কওমি সনদের কার্যক্রম শুরু হয়েছিল ২০০৬ সালে চারদলীয় জোটের সময়ে। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া শুরু করেছিলেন। দাওরায়ে হাদিসকে মাস্টার্সের সমমান ঘোষণা করেছিলেন। প্রজ্ঞাপনও জারি করেছিলেন। ১/১১-এর সরকারের সময় সেটা স্তিমিত হয়ে যায়। আওয়ামী লীগ এসে সে প্রজ্ঞাপন বাতিল করে নতুনভাবে কার্যক্রম শুরু করে। আশা করি, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান কওমি মাদ্রাসার সনদকে কার্যকর করে শিক্ষার্থীদের সরকারি চাকরিতে সুযোগ দেবেন। আমরাও প্রচেষ্টা চালাচ্ছি।
এশিয়া পোস্ট: সময় দেওয়ার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ।
আজিজুল হক: আপনাদেরও ধন্যবাদ।

রোববার, ১৯ এপ্রিল ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২৬ মার্চ ২০২৬
মাওলানা আজিজুল হক ইসলামাবাদী হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের যুগ্ম মহাসচিব। দায়িত্ব পালন করছেন রাজধানীর মাদ্রাসাতুল আতহার আল ইসলামিয়ার প্রিন্সিপাল হিসেবে। হেফাজতে ইসলামের রাজনীতি, সাম্প্রতিক সময়ে সংগঠনের নিষ্ক্রিয়তা, শাপলা চত্বরের শহীদদের তালিকা প্রকাশে দীর্ঘসূত্রতা, সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ‘কওমি জননী’ উপাধি এবং কওমি সনদের স্বীকৃতিসহ নানা বিষয়ে এশিয়া পোস্টের সঙ্গে কথা বলেছেন। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন রায়হান রাশেদ
এশিয়া পোস্টের সাক্ষাৎকারটি হুবুহু বাংলা গ্লোবাল বুলেটিনের পাঠকদের জন্য নিচে দেয়া হলো।
এশিয়া পোস্ট: হেফাজতে ইসলাম দাবি করে, এটি অরাজনৈতিক সংগঠন। কিন্তু এর দায়িত্বশীল অনেকেই কোনো না কোনো রাজনৈতিক দলের নেতা। রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত হয়ে সংগঠনের কর্মসূচি নেওয়া সম্ভব হয়?
আজিজুল হক: আল্লামা শাহ আহমদ শফি (রহ.) ও আল্লামা জুনায়েদ বাবুনগরীসহ (রহ.) দেশের শীর্ষ আলেমদের নেতৃত্বে একটি বৃহৎ লক্ষ্যকে সামনে রেখে হেফাজতে ইসলাম অরাজনৈতিকভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এ সংগঠন অরাজনৈতিক ছিল, আছে এবং থাকবে। রাজনৈতিক নেতারা এখানে যুক্ত আছেন দেশের একজন আলেম হিসেবে। একজন নাগরিক মন্ত্রিত্বের দায়িত্ব পালনের সঙ্গে সঙ্গে দলেরও দায়িত্ব যেমন পালন করেন, হেফাজতের নেতারও তেমন।
ইসলামের মৌলিক বিষয়ে ইসলামবিদ্বেষী শক্তি ষড়যন্ত্র বা চক্রান্ত করলে রাজনৈতিক-অরাজনৈতিক সব আলেমের দায়িত্ব এর প্রতিবাদ ও প্রতিরোধ করা। এই জায়গা থেকে হেফাজতের সঙ্গে যেসব রাজনৈতিক নেতা আছেন, তারা রাজনৈতিক পরিচয়ে হেফাজতে আসেন না, তারা আলেম হিসেবে আসেন। দায়িত্ব পালন করেন। রাজনৈতিক প্রভাবে হেফাজত কর্মসূচি বাস্তবায়ন করে না। রাজনৈতিক নেতাদের দ্বারা হেফাজত প্রভাবিত নয়।
এশিয়া পোস্ট: আল্লামা শাহ আহমদ শফি (রহ.) ও আল্লামা জুনায়েদ বাবুনগরী (রহ.) সংগঠনটির আমির থাকাকালে যে প্রভাব-প্রতিপত্তি ছিল, এখন নেই কেন?
আজিজুল হক: তারা দুজনই দেশের বিখ্যাত আলেম। আল্লামা আহমদ শফি (রহ.) দারুল উলুম দেওবন্দ থেকে পড়াশোনা শেষে চট্টগ্রামের মঈনুল ইসলাম হাটহাজারী মাদ্রাসায় শিক্ষকতা শুরু করেন। অত্যন্ত সুনামের সঙ্গে শিক্ষকতা ও পরে মাদ্রাসা পরিচালনা করেছেন তিনি। দেশে তার লাখো ছাত্র ও অনুসারী আছে। আল্লামা জুনায়েদ বাবুনগরীও (রহ.) বিখ্যাত আলেম ও মুহাদ্দিস। তার বাবাও বড় আলেম। দেশে বাবা-ছেলের লাখো ছাত্র ও অনুসারী ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে। এ দুজনের নেতৃত্বে হেফাজতে ইসলাম প্রতিষ্ঠিত হলে দেশের আলেম ও ধর্মপ্রাণ মুসলিমরা পঙ্গপালের মতো হেফাজতের ব্যানারে ছুটে এসেছে। ঐক্যবদ্ধ হয়েছে। কাজ করেছে। বর্তমান আমির আল্লামা মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরী (দা. বা.)—তিনিও বিখ্যাত আলেম। এ দেশে হাদিস ও আধ্যাত্মিক চর্চায় তার পরিবারের অনেক অবদান রয়েছে। স্বীকার করতে অসুবিধে নেই, আল্লামা আহমদ শফি (রহ.) ও আল্লামা জুনায়েদ বাবুনগরীর (রহ.) যে পরিচিতি, সেটা আল্লামা মুহিববুল্লাহ বাবুনগরীর নেই। তবে দেশের আলেম ও জনগণের কাছে তার ব্যাপক গ্রহণযোগ্যতা ও অবস্থান রয়েছে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট স্বৈরশাসক শেখ হাসিনার পতনের পর তার নেতৃত্বে ৬৪ জেলায় হেফাজতকে সাংগঠনিকভাবে শক্তিশালী করেছি।
আল্লামা আহমদ শফি (রহ.) ও আল্লামা জুনায়েদ বাবুনগরীর (রহ.) সময় হেফাজত যেমন শক্ত অবস্থানে ছিল, এখনও হেফাজত তার সাংগঠনিক শক্তি নিয়ে শক্ত অবস্থানে প্রতিষ্ঠিত আছে। এর প্রমাণ আমরা ২০২৫ সালের ৩ মে রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে মহাসমাবেশ করে জাতিকে জানিয়ে দিয়েছি।
এশিয়া পোস্ট: ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর হেফাজতকে কিছুটা নিষ্ক্রিয় মনে হচ্ছে। কোনো চাপ আছে?
আজিজুল হক: হেফাজতে ইসলাম নিষ্ক্রিয় নয়। হেফাজত ইস্যুভিত্তিক কর্মকাণ্ডে কর্মসূচি বাস্তবায়ন করে। প্রথমত, হেফাজত কওমি আলেমদের সংগঠন, শাবান মাসের শুরুতে মাদ্রাসার পরীক্ষার কারণে কর্মসূচি নিতে পারিনি। দ্বিতীয়ত, নির্বাচন হয়েছে রমজানের আগমুহূর্তে। রমজানে কর্মসূচি পালন সম্ভব নয়। রমজান গেল। এখন মাদ্রাসাগুলো খুললে কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির মিটিং আহ্বান করে পরবর্তী কর্মসূচি নেব। হেফাজত নিষ্ক্রিয় নয়, সমসাময়িক পরিস্থিতির কারণে তেমন দৃশ্যমান তৎপরতা ছিল না।
এশিয়া পোস্ট: নির্বাচনের আগে হেফাজতের আমির মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরী প্রকাশ্যে চট্টগ্রাম-২ (ফটিকছড়ি উপজেলা) আসনের বিএনপি মনোনীত প্রার্থীর পক্ষে ভোট চেয়েছেন। নির্বাচনে ইসলামপন্থি দলও ছিল। তাদের সমর্থন না দিয়ে বিএনপিকে দেওয়ার কারণ কী?
আজিজুল হক: আল্লামা মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরী (রহ.) ২০২৫ সালের শুরু থেকে—বিশেষ করে কওমি ঘরনার ইসলামি দলগুলোকে ঐক্যবদ্ধ করতে চেষ্টা করেছিলেন। একাধিকবার মিটিং ডেকে ছিলেন। গত বছরের রমজানের আগেও তিনি দেশের শীর্ষ ইসলামি রাজনৈতিক দলগুলোকে ঐক্যবদ্ধ করতে মিটিং ডেকে ছিলেন। রমজানের পর ২০২৫ সালের ১২ এপ্রিল আরেকটি মিটিং ডেকে ছিলেন। সেটিও সফল হয়নি। তিনি ঐক্যের যে স্বপ্ন দেখেছিলেন, তা বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি।
ইসলামি জোটের যে প্রধান দল—জামায়াতে ইসলামী—এর প্রতিষ্ঠাতা মরহুম মাওলানা আবু আলা মওদুদীর কয়েকটি বিতর্কিত বিষয়কে হেফাজত আমির কঠিনভাবে নিয়েছেন, যা মুসলমানদের ইমান-আকিদার প্রশ্নে আপসহীন। মওদুদী সাহেব নবী ও সাহাবিদের বিষয়ে যে কথা বলেছেন, এটা ইমান ও আকিদার সঙ্গে সাংঘর্ষিক। হেফাজত আমিরের বক্তব্য হলো, ইমান বাঁচাতে হলে আকিদা সঠিক করতে হবে। আকিদা সঠিক না হলে ভুল আকিদার ভিত্তিতে ইসলাম প্রতিষ্ঠা হবে। আমিসহ আলেমরা তার কাছে জানতে চাইলাম, ‘জামায়াতে ইসলামের নামে রাজনীতি করছে—তারা ইসলামি জোট করেছে। বিএনপি ইসলামি দল বা জোট নয়? আপনি ইসলামি জোটের পক্ষে না থেকে বিএনপির পক্ষে কেন?’ তিনি বললেন, ‘মসজিদের দাঁড়িওয়ালা ইমাম সুন্নতি পোশাক পরে তোমার বাবাকে গালি দিলে মানবে?’ বললাম, ‘না।’ বললেন, ‘মুসল্লিরা দাঁড়িও রাখে না, সুন্নতি পোশাকও পরে না, কিন্তু তোমার বাবাকে গালি দেয় না। কাকে ভালো বলবে, কার পক্ষে অবস্থান নেবে?’ আমরা বিষয়টি বুঝলাম। জামায়াতে ইসলামের পোশাক পরে নবীদের নামে অন্যায় কথা বলা এবং সাহাবিদের সত্যের মাপকাঠি না মানা নিয়ে হেফাজত আমির যে যুক্তি দিয়েছেন, এ যুক্তিতে দেশের আলেমরা ঐক্যবদ্ধ। এ কারণে দেশের আলেমদের বড় একটা অংশ বিএনপির পক্ষ নিয়েছেন। নাগরিক হিসেবে ভোট দেওয়ার অধিকার সবার আছে। প্রত্যেকে তার পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দিয়েছেন।
এশিয়া পোস্ট: নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামী ছাড়া আরও ইসলামপন্থি দল ছিল, তাদের আকিদা সঠিক। কিন্তু হেফাজত আমির তাদের পক্ষ নেননি।
আজিজুল হক: ফটিকছড়িতে বিএনপির বিপরীতে দাঁড়িপাল্লার প্রার্থী ছিল। সেখানে ইসলামপন্থি দলের প্রার্থী ছিল না। তাই হেফাজত আমির তার যুক্তি ও দর্শনের আলোকে বিএনপির প্রার্থীকে সমর্থন দিয়েছেন।
এশিয়া পোস্ট: দেশের অন্যান্য জায়গায় ইসলামপন্থি দলের প্রার্থীরা ছিলেন। তাদের বিষয়ে হেফাজত আমিরের অবস্থান কী ছিল?
আজিজুল হক: যেখানে ইসলামি দলগুলোর প্রার্থী ছিল, আলেমরা তাদের পক্ষে কাজ করেছেন। পছন্দীয় প্রার্থীকে ভোট দেওয়া মানুষের নাগরিক ও সাংবিধানিক অধিকার। এ ক্ষেত্রে হেফাজত আমির তার অবস্থান পরিষ্কার করেছেন।
এশিয়া পোস্ট: আপনি বলেছেন, হেফাজত আমির ইসলামপন্থি দলগুলো নিয়ে ঐক্য করতে একাধিক মিটিং করেছিলেন। কিন্তু ঐক্য করা সম্ভব হয়নি। কেন?
আজিজুল হক: নানাবিধ কারণ আছে। রাজনৈতিক নেতাদের পারস্পরিক বোঝাপড়া, নিজেদের ভবিষ্যৎ চিন্তা ও লাভ-লোকসানের হিসাব ছিল। বিশেষ করে সবারই তো নিজস্ব রাজনৈতিক দর্শন আছে, হয়তো দর্শনের কারণে হেফাজত আমিরের সঙ্গে তাদের মিল হয়নি।
এশিয়া পোস্ট: ২০১৩ সালের ৫ মে মধ্যরাতে রাজধানীর শাপলা চত্বরে হেফাজতের ৯৩ কর্মী শহীদ হয়েছেন বলে গত বছরের ৪ মে আপনারা তালিকা প্রকাশ করেছেন। তালিকা প্রকাশ করতে আপনাদের ১২ বছর লাগল কেন?
আজিজুল হক: ২০১৩ সালের ৫ মে শাপলা চত্বরের ঘটনার পর আওয়ামী ফ্যাসিবাদী জালেমগোষ্ঠী আলেমদের ওপর যে পরিমাণ নির্যাতন করেছে, এটা বর্ণনাতীত। দেশের পুলিশ, র্যাব ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা সরকারের তল্পিবাহক হয়ে সরকারের লাঠিয়াল বাহিনীর পরিচয় দিয়ে ভয়ংকরভাবে শহীদ ও তার পরিবারের ওপর অত্যাচার করেছে। শাপলা চত্বরে শহীদদের অনেকের জানাজা পড়তে দেয়নি। জানাজা পড়তে মাঠে অনুমতি দেয়নি। মাদ্রাসা শিক্ষকের জানাজা তার মাদ্রাসায় পড়তে দেয়নি। শেষ পর্যন্ত এলাকার লোকেরা দা-বঁটি নিয়ে পুলিশকে ধাওয়া দিয়ে ধানক্ষেতে তার জানাজা পড়েছেন। মরদেহ বাড়ি যাওয়ার আগে বাড়ি র্যাব-পুলিশ ঘেরাও করে রেখেছে। পরিবারের মাত্র চার সদস্য জানাজা পড়িয়ে তাকে দাফন করেছে।
তালিকা করতে তদন্ত কমিটি গঠন করলে আমাদের তুলে নেওয়া হয়েছে। হুমকি-ধমকি দেওয়া হয়েছে। হেফাজতের শহীদদের তালিকা যেন না হয়, তাদের কথা যেন জাতি জানতে না পারে, তাদের যেন ইতিহাস থেকে মুছে দেওয়া হয়, এমনকি হেফাজতের শহীদদের অস্বীকার করতে আওয়ামী ফ্যাসিবাদী সরকার পদক্ষেপ গ্রহণ করেছেন। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী করেছে। এমনকি একজনও শহীদ হয়নি বলে তারা ঘোষণা করেছে। আমাদের শতভাগ চেষ্টা থাকা সত্ত্বেও সরকারের চাপের কারণে তালিকা করতে পারিনি। ৫ আগস্টের পর প্রকাশ করেছি।
এশিয়া পোস্ট: হেফাজতের শহীদদের তালিকা করার কারণে মানবাধিকার সংগঠন অধিকারের তৎকালীন সম্পাদক আদিলুর রহমান খান (পরে অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা) ও পরিচালক এএসএম নাসির উদ্দিন এলানের জেল হয়েছে। তারা করতে পেরেছিলেন, কিন্তু দেশব্যাপী হেফাজতের এত নেতাকর্মী থাকার পরও আপনারা পারেননি কেন?
আজিজুল হক: অধিকার একটা আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা। তালিকা করার কারণে অধিকারের আদিল ভাই ও এলান ভাইকে সরকার গ্রেপ্তার করে সাজা দিয়েছে। তালিকা করার কারণে একটা আন্তর্জাতিক সংস্থাকে যদি তারা সাজা দিতে পারে, হেফাজতের দায়িত্বশীলদের তো আন্তর্জাতিক লবিং নেই। আমরা দেশের নিরীহ আলেমসমাজ। পেশিবাদী শক্তিকে মোকাবিলার শক্তি ও সাহস নেই আমাদের। শহীদদের পক্ষে কথা বলার কারণে আমাদের বিরুদ্ধে প্রায় সাড়ে তিনশর মতো মামলা দেওয়া হয়েছে। এই মামলায় হাজার হাজার মানুষ গ্রেপ্তার হয়েছেন। সরকারের চাপের কারণে তালিকা করতে পারেনি।
এশিয়া পোস্ট: শুধু কী ৯৩ জনই শহীদ হয়েছেন?
আজিজুল হক: ৯৩ জন নয়, আরও বেশি হবে। অনেক পরিবার এখনো শহীদদের কথা বলতে চান না ভয়ে। যদি আওয়ামী লীগ ফিরে আসে। যদি তাদের ওপর আবার অত্যাচার করা হয়।
মিডিয়ায় এসেছে, ১৩ সালের ৫ তারিখে জুরাইন কবরে অনেক বেওয়ারিশ লাশ দাফন করা হয়েছে। যাত্রাবাড়ীর ময়লার স্তূপে মানুষের হাড় পাওয়া গেছে। বিভিন্ন মিডিয়া, মানবধিকার সংস্থা ও গোয়েন্দা সংস্থা বলেছে, এগুলো হেফাজতের লাশ। বিশেষ করে আঞ্জুমান মুফিদুল ইসলাম ১৩ সালের মে মাসে প্রায় পাঁচশ বেওয়ারিশ লাশ দাফন করেছে। এগুলো তো দাফন হয়ে গেছে। পরিবারও জানে না, এগুলো কার লাশ। আমরা চেষ্টা করছি, তালিকা আরও সমৃদ্ধি করতে।
এশিয়া পোস্ট: কতজন শহীদ হয়েছেন বলে মনে করেন?
আজিজুল হক: শহীদদের তালিকা দীর্ঘ হবে। এর সঠিক হিসাব নির্ণয় করে বলা সম্ভব নয়।
এশিয়া পোস্ট: অভিযোগ আছে, শাপলা চত্বরে শহীদদের জন্য বিগত ১২ বছর বিচার চায়নি হেফাজতে ইসলাম। শহীদদের পরিবারের পাশেও দাঁড়ায়নি। এর কারণ কী?
আজিজুল হক: কেউ যদি বলে, হেফাজত শহীদদের পাশে দাঁড়ায়নি—অত্যন্ত ভুল হবে। হেফাজত তার শক্তি ও সামর্থ্য অনুযায়ী ২০১৩ সালেই শহীদ পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করেছে। বিভিন্ন জেলায় টিম গিয়ে সহযোগিতা করেছে। প্রত্যেক পরিবার কমবেশি হেফাজতের সহযোগিতা পেয়েছে। কোনো পরিবারকে একাধিকবার সহযোগিতা করা হয়েছে। কাউকে ঘর দেওয়া হয়েছে। কারও মেয়ের বিয়ের ব্যবস্থা করা হয়েছে। একজন শহীদের নামে মাদ্রাসা করা হয়েছে। তাদের সহযোগিতা করেনি, এটা মিথ্যা প্রচারণা।
এশিয়া পোস্ট: ১২ বছর বিচার চেয়েছিলেন?
আজিজুল হক: আমরা শতবার সংবাদ সম্মেলন ও মিছিল করে বিচার চেয়েছি। আওয়ামী ফ্যাসিবাদি সরকার—যারা শহীদ করেছে, তারা কি শহীদদের বিচার করবে? জালেমরা তো করবে না। অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের পরপরই আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনালে হেফাজতের পক্ষে আমি বাদী হয়ে অভিযোগ করেছি। এই মামলায় সরকারের শীর্ষ কর্মকর্তা, মন্ত্রী-এমপিরা জেলে আছেন। বিচার কার্যক্রম শুরু হয়েছে। সাক্ষী সংগ্রহ করা হয়েছে। বিশ্বাস করি, শাপলা চত্বরে হত্যাকাণ্ডের বিচারের মুখোমুখি জালেমদের করতে পারব।
এশিয়া পোস্ট: যে আওয়ামী লীগ সরকার হেফাজত কর্মীদের শহীদ করল, সে সরকারের প্রধান শেখ হাসিনাকে আপনারা শোকরানা মাহফিল করে সম্মাননা দিলেন। অথচ তখনও হেফাজতের শহীদদের তালিকা করা যায়নি, বিচারও হয়নি। এটা কী হেফাজতের শহীদদের রক্তের সঙ্গে প্রতারণা নয়?
আজিজুল হক: এ বিষয়ে একটা ভুল বার্তা জাতির কাছে আছে। হেফাজত একটা আলাদা সংগঠন, কওমি মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ড আলাদা প্রতিষ্ঠান। শিক্ষা বোর্ডের সঙ্গে সরকারের যোগাযোগ থাকাটা স্বাভাবিক। শাপলা চত্বরে যারা গণহত্যা চালিয়েছে, তাদের সঙ্গে হেফাজতের সম্পর্ক থাকতে পারে না। আল্লামা আহমদ শফি তখন হেফাজতের আমির, আবার কওমি মাদ্রাসার সর্বোচ্চ শিক্ষা বোর্ড আল-হাইয়াতুল উলয়ারও চেয়ারম্যান। শাপলা চত্বরের হত্যাকাণ্ডকে মুছে দেওয়া ও আলেমদের নিয়ন্ত্রণের কুমতলবে সরকার দাওরায়ে হাদিসকে মাস্টার্সের সমমান স্বীকৃতি দিয়েছে। স্বীকৃতির দাবি হেফাজতের ছিল না, এটা কওমি মাদ্রাসা বোর্ডের দাবি ছিল। সরকার স্বীকৃতি দিয়ে একটা রাজনৈতিক ডিগবাজি খেলেছে। এই স্বীকৃতি একটা কলাপাতা, কোনো মূল্য নেই। স্বীকৃতি দিয়ে ছাত্ররা কিছু করতে পারে না—এটা ধোঁকাবাজি। রাজনৈতিক প্রতারণার আশ্রয় নিতে দেওয়া হয়েছে।
শোকরানা মাহফিলের আয়োজক ছিল সরকার। সে মাহফিলে খুনি হাসিনার সামরিক সচিব মিয়া মো. জয়নাল আবেদিন দাঁড়িয়ে শাপলা চত্বরের গণহত্যাকে অস্বীকার করলেন। হেফাজতের পক্ষ থেকে আল্লামা জুনায়েদ বাবুনগরী—তিনি তখন মহাসচিব—তিনি শোকরানা মাহফিলে অংশ নেননি, সাংগঠনিক সম্পাদক হিসেবে আমিও অংশ নিইনি, বর্তমান আমির আল্লামা মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরী অংশ নেননি, আরও অনেক আলেম উপস্থিত হননি—আমরা শক্ত প্রতিবাদ করে তার বক্তব্য প্রত্যাখ্যান করেছিলাম। শোকরানা মাহফিলে হেফাজতের কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই। আহমদ শফি বোর্ডের চেয়ারম্যান হিসেবে সেখানে উপস্থিত হয়েছিলেন, হেফাজতের আমির হিসেবে নন।
এশিয়া পোস্ট: আপনি বললেন, সনদ দিয়ে ডিগবাজি খেলা হয়েছে এবং শহীদদের রক্তকে মুছে দিতে দেওয়া হয়েছে। এসব জেনেও কেন স্বীকৃতি নিলেন?
আজিজুল হক: এটা একান্ত আমার মতামত। সরকারের এই কূটচাল বোঝা সহজ-সরল আলেমদের পক্ষে সম্ভব নয়। তারা এটা করে প্রতিবাদী শক্তিশালী আলেমসমাজকে দমিয়ে রাখার ষড়যন্ত্র করেছে।
এশিয়া পোস্ট: ২০১৮ সালের ৪ নভেম্বর রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে আল-হাইআতুল উলয়া লিল-জামিয়াতিল কওমিয়া বাংলাদেশ আয়োজিত শোকরানা মাহফিলে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ‘কওমি জননী’ উপাধিতে ভূষিত করা হয়। সেখানে আহমদ শফি (রহ.) থেকে শুরু করে হেফাজতের প্রায় সব বড় নেতারা ছিলেন। আপনারা কী তাকে ‘কওমি জননী’ হিসেবে স্বীকৃতি দেন?
আজিজুল হক: হেফাজতের নেতাদের ওপর যে আওয়ামী লীগ গণহত্যা চালাল, সে সরকারের প্রধান শেখ হাসিনাকে হেফাজতের পক্ষ থেকে কওমি জননী উপাধি দেওয়া অবাস্তব কথা। হেফাজত তাকে কওমি জননী উপাধি দেয়নি। গওহরডাঙ্গা বোর্ডের চেয়ারম্যান মাওলানা রুহুল আমিন, তার বাড়ি গোপালগঞ্জ। তিনি শেখ হাসিনার গৃহপালিত ব্যক্তি। তিনি গৃহপালিত বায়তুল মোকাররমের খতিব ছিলেন। তিনি তার রাজনৈতিক স্বার্থ হাসিলের জন্য শেখ হাসিনাকে কওমি জননী উপাধি দিয়েছেন। হেফাজত বা হেফাজতের নেতা দেয়নি। তার সঙ্গে হেফাজতের সম্পর্ক নেই, তার সঙ্গে শেখ হাসিনার সম্পর্ক। তিনি হাসিনাকে তুষ্ট করতে এ উপাধি দিয়েছেন।
এশিয়া পোস্ট: কিন্তু ওই মঞ্চে তো হেফাজত নেতারা বা বোর্ড এর প্রতিবাদ করেনি। পরে সংবাদ সম্মেলন করে কি হেফাজত বলেছিল বা কওমি মাদ্রাসার পক্ষে আপনারা বলেছিলেন, আমরা তাকে কওমি জননী উপাধি দেইনি, এটা মাওলানা রুহুল আমিনের ব্যক্তিগত ব্যাপার।
আজিজুল হক: উপস্থিতরা কেন প্রতিবাদ করেননি, তাদের ব্যাপার। জুনায়েদ বাবুনগরী (রহ.)-এর পক্ষে আমি বিবৃতি দিয়ে সেটা প্রত্যাখ্যান করেছি। এ উপাধি হেফাজত দেয়নি, জাতিকে জানিয়েছি আমরা।
এশিয়া পোস্ট: কওমি সনদের স্বীকৃতি দিয়ে সরকারি চাকরিতে আবেদন করা যায় না। বেসরকারি চাকরিতেও এর গুরুত্ব নেই। কওমি শিক্ষার্থীদের মধ্যে এ নিয়ে চরম অসন্তুষ্টি আছে। স্বীকৃতিতে আসলে কী লাভ হলো?
আজিজুল হক: আমি একটু আগে বলেছি, রাজনৈতিক প্রতারণার আশ্রয় নিয়ে সরকার কওমি আলেমদের চোখে ধুলা দিয়েছে। যে স্বীকৃতি দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষায় অংশ নিতে পারব না, সরকারি চাকরি পাব না, বিসিএস পরীক্ষা দিতে পারব না, বিদেশি চাকরি নিতে পারব না, তাহলে এটা দিয়ে কি লাভ! আমি মনে করি, কওমি মাদ্রাসার তরুণ আলেমদের কাছে টানতে তারা এই প্রতরণা করেছে। সেটা বুমেরাং হয়েছে।
এশিয়া পোস্ট: সনদের স্বীকৃতি নিয়ে নতুন করে কিছু ভাবছেন?
আজিজুল হক: হেফাজতের পক্ষে অন্তর্বর্তী সরকারের কাছে আবেদন করেছিলাম, দেশের ৬৫ হাজার প্রাইমারি স্কুলের ধর্মীয় শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে এ সনদকে স্বীকৃতি দিতে। দাওরায়ে হাদিস পাস শিক্ষার্থীদের জন্য ধর্মীয় শিক্ষকের পদ সৃষ্টি করতে। একটা প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। এ বিষয়ে হেফাজত ও আল-হাইয়াতুল উলয়ার নেতারা তৎকালীন ধর্ম উপদেষ্টা আ ফ ম খালিদ হোসেন, উপদেষ্টা আদিলুর রহমান খানসহ শিক্ষা উপদেষ্টার সঙ্গে একাধিক বৈঠক করেছেন। এই সরকারের শিক্ষামন্ত্রীর সঙ্গে এ বিষয়ে আলাপ করেছি। তিনি সংসদে আলোচনা করেছেন।
কওমি সনদের কার্যক্রম শুরু হয়েছিল ২০০৬ সালে চারদলীয় জোটের সময়ে। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া শুরু করেছিলেন। দাওরায়ে হাদিসকে মাস্টার্সের সমমান ঘোষণা করেছিলেন। প্রজ্ঞাপনও জারি করেছিলেন। ১/১১-এর সরকারের সময় সেটা স্তিমিত হয়ে যায়। আওয়ামী লীগ এসে সে প্রজ্ঞাপন বাতিল করে নতুনভাবে কার্যক্রম শুরু করে। আশা করি, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান কওমি মাদ্রাসার সনদকে কার্যকর করে শিক্ষার্থীদের সরকারি চাকরিতে সুযোগ দেবেন। আমরাও প্রচেষ্টা চালাচ্ছি।
এশিয়া পোস্ট: সময় দেওয়ার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ।
আজিজুল হক: আপনাদেরও ধন্যবাদ।

আপনার মতামত লিখুন