টেকনাফে বিশ্বব্যাংক ও ইউএনডিপি প্রকল্প ঘিরে পরিবেশগত প্রশ্ন
কক্সবাজারের টেকনাফে সংরক্ষিত বনাঞ্চলের একটি বিশাল অংশ জুড়ে নির্মাণ করা হচ্ছে সুউচ্চ এক সীমানা প্রাচীর (বাউন্ডারি)। বনবিভাগের তীব্র আপত্তি ও লিখিত নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্ত্বেও বনাঞ্চলের ভেতরে এই নির্মাণকাজ অব্যাহত রয়েছে।সরেজমিনে দেখা গেছে, টেকনাফ রেঞ্জের মুচনী বিটের নয়াপাড়া শালবাগানস্থ ২৬ নম্বর রোহিঙ্গা ক্যাম্পের সেগুন বাগান এলাকায় বনের বুক চিরে এই সুউচ্চ দেওয়াল তোলা হচ্ছে। বাস্তবায়নকারী এনজিও সংস্থা ও তদারকির দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিরা দাবি করছেন যে, বনবিভাগের অনুমতি নিয়েই এটি করা হচ্ছে। তবে কক্সবাজার দক্ষিণ বিভাগীয় বন কর্মকর্তার (ডিএফও) কার্যালয় এই দাবি সম্পূর্ণ নাকচ করে দিয়েছে।বনবিভাগ সূত্রে জানা গেছে, ২৬ নম্বর ক্যাম্পের পেছনের এই সংরক্ষিত বনাঞ্চলটি মূলত বন্যহাতি চলাচলের একটি নিয়মিত করিডোর। পাহাড় পরিবেষ্টিত এই পাদদেশ দিয়েই হাতিগুলো যাতায়াত করে। সেখানে দেওয়াল নির্মাণের ফলে হাতির চলাচলের পথ পুরোপুরি রুদ্ধ হয়ে যাচ্ছে।এছাড়া, এই এলাকাটি প্রায় ২৭০ প্রজাতির বন্যপ্রাণীর প্রাকৃতিক অভয়ারণ্য এবং তাদের প্রধান খাদ্য উৎপাদনস্থল। টেকনাফ গেম রিজার্ভের আওতাধীন এই বনাঞ্চলে এখনো বিভিন্ন প্রজাতির বানর, শিয়াল, ভাল্লুক, বনমোরগ ও সরীসৃপ প্রাণীর বিচরণ চোখে পড়ে। রোহিঙ্গাদের আবাসস্থল নির্মাণের কারণে এমনিতেই বন্যপ্রাণী খাদ্য সংকট ও বাসস্থান ঝুঁকিতে পড়ে গহীন বনে আশ্রয় নিয়েছে। তার ওপর এই বিশাল প্রাচীর বনের গাছপালা, পরিবেশ ও বন্যপ্রাণীর অস্তিত্বকে চরম সংকটে ফেলবে বলে আশঙ্কা করছেন বন বিশেষজ্ঞরা।অনুসন্ধানে জানা গেছে, বিশ্ব ব্যাংকের অর্থায়নে জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচি সরাসরি এই প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে। বনের ভেতরে ক্যাম্পের বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্য এই কেন্দ্র ও বাউন্ডারি নির্মাণ করা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন কাজ তদারকির দায়িত্বে থাকা প্রতিনিধি মুখতার। সংশ্লিষ্ট সূত্রমতে, নির্মিতব্য এই বাউন্ডারির উচ্চতা ৫ মিটার (প্রায় ১৬ দশমিক ৪ ফুট) এবং দৈর্ঘ্য প্রায় ১৩৭ মিটার। বর্তমানে দেওয়াল নির্মাণের কাজ প্রায় শেষের পথে, শুধু পলেস্তারা ও ফিনিশিংয়ের কাজ বাকি রয়েছে।স্থানীয় বাসিন্দা ও পরিবেশবাদীদের মতে, বর্জ্য ব্যবস্থাপনার নামে বনের ভেতরে এত বড় স্থাপনা তৈরি হলে পরিবেশের স্থায়ী ক্ষতি হবে। এছাড়া, রোহিঙ্গা নেতাদের একাংশ আশঙ্কা করছেন, দুর্গম বনের ভেতর এই সুউচ্চ দেওয়ালকে কেন্দ্র করে দূর ভবিষ্যতে অপরাধীদের একটি নিরাপদ আস্তানা বা ‘অপরাধ জোন’ গড়ে উঠতে পারে।সরোয়ার আলম দীপু (বন্যপ্রাণী গবেষক) বলেন, সংরক্ষিত বনাঞ্চলে যেকোনো ধরনের স্থাপনা তৈরি করার আগে অবশ্যই ‘ইনভাইরনমেন্টাল ইমপ্যাক্ট অ্যাসেসমেন্ট’ বা পরিবেশগত প্রভাব নিরূপণ করা বাধ্যতামূলক। তা না হলে বন ও বন্যপ্রাণীর ওপর এর দীর্ঘমেয়াদি মারাত্মক প্রভাব পড়বে।মোহাম্মদ আব্দুল হান্নান (২৬নং রোহিঙ্গা ক্যাম্পের ইনচার্জ - সিআইসি), এসব প্রকল্প বাস্তবায়নে আমাদের সরাসরি কোনো ভূমিকা নেই। যতটুকু জানি, শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার কার্যালয়ের মাধ্যমে ইউএনডিপি এই প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে।মো. আব্দুল্লাহ আল মামুন (বিভাগীয় বন কর্মকর্তা - ডিএফও, কক্সবাজার দক্ষিণ) বলেন, সংরক্ষিত বনাঞ্চল এবং হাতি চলাচলের করিডোরে এই বিশাল দেওয়াল নির্মাণের বিষয়টি জানার পরপরই আমরা কাজ বন্ধের উদ্যোগ নিই। বনাঞ্চলে বাউন্ডারি নির্মাণ না করতে গত ২৬ মে আরআরআরসি অফিসে লিখিত চিঠি পাঠানো হয়েছে। বনবিভাগের পক্ষ থেকে এই কাজের কোনো অনুমতি দেওয়া হয়নি।