উচ্ছেদ অভিযান নাকি লোকদেখানো আয়োজন? প্রশ্ন পান্থপথের পথচারীদের
ঢাকা উত্তরের অন্যতম ব্যস্ত এলাকা পান্থপথ। আর এই এলাকার মূল আকর্ষণ দেশের অন্যতম বৃহৎ শপিং মল 'বসুন্ধরা সিটি'। প্রতিদিন হাজার হাজার কেনাকাটা করতে আসা মানুষ ও সাধারণ পথচারীর পদচারণায় মুখরিত থাকে এই এলাকা। অথচ শপিং মলটির সামনের ফুটপাত যেন পথচারীদের চলাচলের জন্য নয়, বরং হকারদের স্থায়ী হাট!সম্প্রতি সিটি করপোরেশন ও ট্রাফিক পুলিশ যৌথভাবে এখানে এক ধুমধাম উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করে। কড়া হুঁশিয়ারি, সিটির কর্মকর্তাদের বক্তব্য, মাইকিং আর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অভিযানের 'লাইভ' প্রচার সব মিলিয়ে তৈরি করা হয়েছিল এক তুলকালাম কাণ্ড। কিন্তু সেই অভিযানের লাইভ স্ট্রিমিং আর ক্যামেরার আলো নিভতেই উধাও হয়ে গেছে কর্তৃপক্ষের সব তোড়জোড়। ফলাফল, ফুটপাতে ফের জাঁকিয়ে বসেছে হকারদের রাজত্ব।অভিযান চলার সময় বসুন্ধরা সিটির সামনের ফুটপাত বেশ ফাঁকা ও সুশৃঙ্খল দেখা গেলেও, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও সিটি করপোরেশনের গাড়ি এলাকা ছাড়ার এক ঘণ্টার মধ্যেই দৃশ্যপট বদলে যায়। উচ্ছেদ হওয়া হকাররা তাদের চৌকি ও মালামাল নিয়ে আবারও আগের জায়গায় ফিরে আসেন। জামাকাপড়, জুতা, বেল্ট, মোবাইল অ্যাকসেসরিজসহ নানা পণ্যের পসরা সাজিয়ে বসেছেন তারা। ফুটপাত পুরোপুরি দখল হয়ে যাওয়ায় কেনাকাটা করতে আসা মানুষ এবং সাধারণ পথচারীদের বাধ্য হয়ে নেমে আসতে হচ্ছে ব্যস্ত মূল সড়কে। বাসের সঙ্গে গা ঘেঁষে ঝুঁকিপূর্ণভাবে হাঁটতে গিয়ে যেকোনো মুহূর্তে বড় ধরনের দুর্ঘটনার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। এ ছাড়া পথচারীরা রাস্তায় নেমে আসায় এবং হকারদের ঘিরে থাকা ক্রেতাদের উপচে পড়া ভিড়ে মূল সড়কে যানবাহনের গতি কমে গিয়ে সৃষ্টি হচ্ছে দীর্ঘ যানজট।আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও সিটি করপোরেশনের এমন "ক্যামেরা সর্বস্ব" অভিযানে চরম ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন সাধারণ পথচারীরা।নিয়মিত এই পথ দিয়ে যাতায়াতকারী বেসরকারি চাকরিজীবী প্রদীপ কুমার দে তীব্র ক্ষোভ ও হতাশা প্রকাশ করে বলেন, "অভিযানের সময় পুলিশ আর সিটি করপোরেশনের লোকজনের ফুটপাতে যে তোড়জোড় ছিল, তা দেখলে মনে হবে যেন চিরতরে ফুটপাত মুক্ত হয়ে গেল! কিন্তু পেজের 'লাইভ' স্ট্রিমিং শেষ, ক্যামেরা বন্ধ ব্যস্, তাদের অভিযানও শেষ। আমরা যারা সাধারণ পথচারী, আমাদের প্রতিদিন এই ঝুঁকি নিয়ে রাস্তায় হাঁটতে হয়। ক্যামেরা ধরে এ ধরনের লোকদেখানো নাটক বা ফটোসেশন করে আমাদের কী লাভ? তদারকি ছাড়া এমন খণ্ডকালীন অভিযানের কোনো অর্থই হয় না।"কেনাকাটা করতে আসা গৃহিণী সামিয়া সুলতানা ছোট সন্তানকে নিয়ে মূল সড়ক দিয়ে হেঁটে আসার সময় বিরক্তি প্রকাশ করে বলেন, "বসুন্ধরা সিটির মতো জায়গায় ছোট বাচ্চা নিয়ে আসাটাই এখন কষ্টের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফুটপাতে দাঁড়ানোর মতো জায়গা নেই, সব হকারদের দখলে। অভিযানের দিন টিভিতে দেখলাম পুরো এলাকা পরিষ্কার, অথচ দুদিন পরেই এসে দেখি আবার আগের মতো অবস্থা। আমরা কি ট্যাক্স দিই মূল রাস্তা দিয়ে গাড়ির ধাক্কা খেতে খেতে হাঁটার জন্য?"কাছেই একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আরিফুল ইসলাম ফুটপাতের স্থায়ী সমাধান নিয়ে প্রশ্ন তুলে বলেন, "সিটি করপোরেশন ও পুলিশের এই অভিযানগুলো এখন স্রেফ এক ঘণ্টার আইওয়াশ ছাড়া আর কিছু না। ক্যামেরা থাকলে উচ্ছেদ, ক্যামেরা সরলেই দখল। অভিযান শেষে তদারকির জন্য যদি একজন পুলিশও না থাকে, তবে এই লোকদেখানো উচ্ছেদ নাটক করার কী দরকার?"উচ্ছেদ অভিযানের পর নিয়মিত তদারকি ও কঠোর নজরদারি না থাকলে এ ধরনের উদ্যোগ কোনো কাজে আসে না। স্রেফ আইওয়াশ বা সাময়িক "শো-অফ" বন্ধ করে বসুন্ধরা সিটির মতো গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে স্থায়ী নজরদারি ও কঠোর মনিটরিংয়ের ব্যবস্থা না করলে ফুটপাত মুক্ত করা কখনোই সম্ভব হবে না।