ঢাকা    মঙ্গলবার, ২১ জুলাই ২০২৬
বাংলা গ্লোবাল বুলেটিন

নতুন নেতৃত্বে আইসিটি ও যোগাযোগ খাত: জনকল্যাণে এখনই সময়োপযোগী সংস্কার

বাংলাদেশ বর্তমানে এক যুগান্তকারী অগ্রযাত্রার পথে। ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’ থেকে ‘স্মার্ট বাংলাদেশ’-এ এই উত্তরণ কেবল প্রযুক্তির প্রসারের নামান্তর নয়; এটি রাষ্ট্র পরিচালনার দর্শন, সেবার মানোন্নয়ন এবং নাগরিক জীবনে প্রযুক্তির কার্যকর প্রয়োগের এক অবিচ্ছেদ্য অধ্যায়। ঠিক এই মুহূর্তে ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ে নতুন নেতৃত্বের আবির্ভাব দেশবাসীর মনে নতুন আশার সঞ্চার করেছে। এই প্রত্যাশা বাস্তবে রূপ দিতে আইসিটি ও যোগাযোগ বিভাগের প্রধান চ্যালেঞ্জ এখন—প্রযুক্তিকে জনগণের কল্যাণে একটি শক্তিশালী মাধ্যম হিসেবে গড়ে তোলা।প্রযুক্তি ও যোগাযোগ: আধুনিক রাষ্ট্রের মেরুদণ্ডবিশ্বব্যাপী অভিজ্ঞতা সাক্ষ্য দেয়, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ সরাসরি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, কর্মসংস্থান ও প্রশাসনিক দক্ষতা বৃদ্ধি করে। আন্তর্জাতিক টেলিযোগাযোগ ইউনিয়ন (আইটিইউ)-এর গবেষণা বলছে, ব্রডব্যান্ডের সুবিধা মাত্র ১০ শতাংশ বাড়লেই জিডিপি উল্লেখযোগ্য হারে বেড়ে যায়। তাই যোগাযোগ ব্যবস্থা ও ডিজিটাল সেবা এখন আর বিলাসিতা নয়; এটি টেকসই উন্নয়নের অপরিহার্য পূর্বশর্ত।১. যোগাযোগ অবকাঠামো: গ্রাম-শহরের বৈষম্য দূর করার সেতুবন্ধনআমাদের দেশে এখনও ডিজিটাল বিভাজন প্রকট। শহরাঞ্চলে হাই-স্পিড ইন্টারনেট সহজলভ্য হলেও গ্রামের অধিকাংশ মানুষ এখনও ধীরগতি ও ব্যয়বহুল সংযোগে সীমাবদ্ধ।জরুরি পদক্ষেপসমূহ: প্রতিটি ইউনিয়নে ফাইবার অপটিক নেটওয়ার্ক পৌঁছে দেওয়া এবং ন্যূনতম নিশ্চিত ব্যান্ডউইথ নিশ্চিত করা। দুর্গম অঞ্চলে ইন্টারনেট সেবা সহজলভ্য করতে ইউনিভার্সাল সার্ভিস ফান্ড (ইউএসএফ)-এর কার্যকর ও স্বচ্ছ ব্যবহার নিশ্চিত করা। শিল্পাঞ্চল, বন্দর ও স্মার্ট সিটি প্রকল্পে ৫জি প্রযুক্তির পরীক্ষামূলক কার্যক্রম শুরু করা। বাংলাদেশ সাবমেরিন কেবল কোম্পানি লিমিটেডের সক্ষমতা সর্বোচ্চ কাজে লাগিয়ে আন্তর্জাতিক ব্যান্ডউইথের খরচ কমানো।   ২. সরকারি সেবার ডিজিটাল রূপান্তর: নাগরিকের দুর্ভোগ লাঘবের পথসরকারি সেবায় ডিজিটালায়ন বাড়লেও এখনও বহু সেবা কাগজনির্ভর ও জটিল প্রক্রিয়ায় আবদ্ধ। এর ফলে নাগরিকদের সময় নষ্ট, দুর্নীতি ও ভোগান্তি চরমে পৌঁছায়।সমাধানের মূলপথ: জন্মনিবন্ধন, ভূমি সেবা, পাসপোর্ট, সামাজিক নিরাপত্তা ভাতা—সকল সেবা একটি সমন্বিত ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে নিয়ে আসা। বাংলা ভাষাভিত্তিক মোবাইল অ্যাপ ও ভয়েস-অ্যাসিস্ট্যান্ট চালু করা, যাতে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীও সেবা নিতে পারেন। অনলাইনে অভিযোগ দাখিল, ট্র্যাকিং এবং নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে নিষ্পত্তি বাধ্যতামূলক করা। এই ক্ষেত্রে ‘এটুআই’ কর্মসূচির সাফল্যকে আরও ব্যাপক পরিসরে ছড়িয়ে দেওয়া জরুরি। ৩. শিক্ষা ও স্বাস্থ্য: আইসিটির মাধ্যমে মানবসম্পদ গঠনডিজিটাল শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য সবচেয়ে বড় বিনিয়োগ।শিক্ষায়: প্রত্যন্ত অঞ্চলে ভার্চুয়াল ক্লাসরুম ও অনলাইন কারিগরি প্রশিক্ষণ চালু করা। জাতীয় ই-লার্নিং প্ল্যাটফর্ম ও ডিজিটাল কনটেন্ট ব্যাংক তৈরি করা। স্বাস্থ্যে: প্রতিটি নাগরিকের জন্য ডিজিটাল হেলথ আইডি চালু করা। উপজেলা পর্যায় পর্যন্ত টেলিমেডিসিন ও ই-প্রেসক্রিপশন সেবা সম্প্রসারণ করা। ইউনেস্কো ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার গবেষণা বলছে, ডিজিটাল স্বাস্থ্য ও ই-লার্নিং মানব উন্নয়নে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনতে পারে।৪. দক্ষ মানবসম্পদ ও কর্মসংস্থান: তারুণ্যের সম্ভাবনাকে কাজে লাগানোবাংলাদেশের বিপুল তরুণ জনগোষ্ঠী আমাদের সবচেয়ে বড় শক্তি। এই জনশক্তিকে দক্ষ মানবসম্পদে রূপান্তর না করলে ‘ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড’ কাজে লাগানো সম্ভব হবে না।করণীয়: কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), ক্লাউড কম্পিউটিং, সাইবার সিকিউরিটি ও ডেটা অ্যানালিটিক্সে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় প্রশিক্ষণ ও সার্টিফিকেশন চালু করা। ফ্রিল্যান্সার ও স্টার্টআপ উদ্যোক্তাদের জন্য সহজ শর্তে কর ও নীতিমালা প্রণয়ন। বিশ্ববিদ্যালয়, শিল্পপ্রতিষ্ঠান ও স্টার্টআপদের মধ্যে সংযোগ সেতু তৈরি করা। ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের মতে, ভবিষ্যতের কর্মসংস্থান পুরোপুরি প্রযুক্তিনির্ভর দক্ষতার ওপর নির্ভরশীল হবে।৫. সাইবার নিরাপত্তা ও ডেটা সুরক্ষা: আস্থার ভিত্তিএকটি শক্তিশালী ডিজিটাল রাষ্ট্র গড়তে নাগরিকের তথ্যের সুরক্ষা নিশ্চিত করা অপরিহার্য।প্রয়োজনীয় উদ্যোগ: আধুনিক ও সময়োপযোগী ডেটা সুরক্ষা আইন প্রণয়ন। সরকারি ও বেসরকারি খাতের ডেটার জন্য স্তরভিত্তিক নিরাপত্তানীতি তৈরি। সাইবার অপরাধ দমনে দক্ষ জনবল ও আধুনিক ফরেনসিক পরীক্ষাগার প্রতিষ্ঠা। নিরাপদ ডিজিটাল পরিবেশ ছাড়া ‘স্মার্ট বাংলাদেশ’ শুধু একটি কল্পনা হয়ে থাকবে।৬. স্মার্ট অর্থনীতি ও স্থানীয় সরকার সরকারি লেনদেনে ক্যাশলেস ব্যবস্থা চালু করা। ডিজিটাল ট্যাক্স ও কাস্টমস প্রক্রিয়া স্বয়ংক্রিয়করণ। স্মার্ট সিটি ও স্মার্ট ভিলেজ গড়ে তোলা, যেখানে আইওটি প্রযুক্তির মাধ্যমে পানি, বিদ্যুৎ, ট্রাফিক ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা হবে। বিশ্বব্যাংকের গভটেক বিশ্লেষণ বলছে, ডিজিটাল সরকার ব্যবস্থা সুশাসন ও রাজস্ব আয় বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।\নতুন আইসিটি নেতৃত্বের সামনে সুযোগ যেমন বিপুল, দায়িত্বও ততটাই গভীর। যোগাযোগ অবকাঠামো, নাগরিককেন্দ্রিক ডিজিটাল সেবা, মানবসম্পদ উন্নয়ন ও সাইবার নিরাপত্তা—এই চার স্তম্ভের ওপর সমন্বিত সংস্কার বাস্তবায়ন করা গেলে প্রযুক্তি নগরবাসীর একচেটিয়া সুবিধা না থেকে গ্রাম ও শহরের সব নাগরিকের জন্য উন্নয়নের সোপানে পরিণত হবে। তবেই বাংলাদেশ একটি প্রকৃত জনবান্ধব, দক্ষ ও স্মার্ট রাষ্ট্র হিসেবে বিশ্বসভায় মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারবে।  

নতুন নেতৃত্বে আইসিটি ও যোগাযোগ খাত: জনকল্যাণে এখনই সময়োপযোগী সংস্কার