প্রিন্ট এর তারিখ : ২৯ জুলাই ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ২৯ জুলাই ২০২৬
সুন্দরবনসংলগ্ন মোংলায় নিখোঁজ মিরাজ: গুমের অভিযোগে দেশ-বিদেশে উদ্বেগ
অনলাইন ডেস্ক ||
বাগেরহাটের মোংলার সুন্দরবন সংলগ্ন জয়মনির ঘোল এলাকা থেকে মিরাজ শেখ (৩০) নামে এক যুবক নিখোঁজের সাড়ে তিন মাস পেরিয়ে গেলেও তার কোনো হদিস মেলেনি। পরিবারের অভিযোগ, কোস্টগার্ড সদস্যরা তুলে নিয়ে যাওয়ার পর থেকেই তিনি নিখোঁজ। এই ঘটনায় কোস্টগার্ডের দায় অস্বীকার, পাল্টা মামলা এবং মানবাধিকার কর্মীদের উদ্বেগের মধ্যে বিষয়টি উচ্চ আদালত পর্যন্ত গড়িয়েছে।একদিকে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআরডব্লিউ) এই ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে, অন্যদিকে হাইকোর্ট নিখোঁজ মিরাজকে ১৫ দিনের মধ্যে সশরীরে হাজির করার নির্দেশ দিয়েছেন।নিখোঁজ মিরাজ শেখ পেশায় একজন জেলে ও ভাড়ায়চালিত মোটরসাইকেল চালক। তার স্ত্রী ও একটি ছোট সন্তান রয়েছে।ঘটনার শুরু ও প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনাগত ১০ এপ্রিল সন্ধ্যা আনুমানিক ৭টার সময় মোংলার জয়মনির ঘোল এলাকার একটি চায়ের দোকানের সামনে থেকে মিরাজ শেখকে আটক করা হয়। প্রত্যক্ষদর্শী স্থানীয় দোকানদার মোহাম্মদ আলামিন শেখ বলেন, ‘দুইজন সিভিল পোশাকধারী লোক এসে মিরাজকে ধরে নিয়ে যায়। ৫-৬ মিনিট পর তারা ফিরে এসে মিরাজের মোটরসাইকেলটি আমার দোকানে রাখতে বলে। আমি রাখতে না চাইলেও তারা জোর করে রেখে যায়।’আলামিন আরও জানান, এর ১০-১১ দিন পর রাত ৪টার দিকে রবিন নামে একজন কোস্টগার্ড সদস্য এসে মিরাজের চাবি দিয়েই মোটরসাইকেলটি চালিয়ে নিয়ে যান। যদিও কোস্টগার্ড এখন মোটরসাইকেলের বিষয়টিও অস্বীকার করছে।আরেক প্রত্যক্ষদর্শী প্রতিবেশী সেলিনা বেগম জানান, মিরাজকে ধরে নিয়ে তেঁতুল তলায় মারধর করা হয় এবং পরে একটি সাদা রঙের বোটে তুলে মুখে কাপড় চেপে ধরে হারবাড়িয়া কোস্টগার্ড পন্টুনে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে কোস্টগার্ডের পোশাক পরিহিত আরও ৭-৮ জন সদস্য একটি কালো স্পিডবোটে করে তাকে মোংলার দিকে নিয়ে যান।সেলিনা বলেন, ‘ওখানে নিয়ে মিরাজকে মারধর করা হয় এবং কালো কম্বল দিয়ে ঢেকে রাখা হয়।’‘চোখের সামনে থেকে নিয়ে গেল’নিখোঁজ মিরাজের বোন লিজা ইসলাম বলেন, ‘১০ এপ্রিল সন্ধ্যা ৭টায় হারবাড়িয়া স্টেশন থেকে দুইজন কোস্টগার্ড ও একজন নৌকার মাঝি (মিজান) এসে আমার ভাইকে ধরে নিয়ে যায়। ছোট নৌকা হওয়ায় মান্নান মাঝি নামে একজনের বোট ভাড়া করে মিরাজকে হারবাড়িয়া স্টেশনের পন্টুনে নেওয়া হয়। সেখানে মারধরের চিৎকার শোনা গেছে। ৩০ মিনিট পর দিগরাজ থেকে ‘বাংলাদেশ কোস্টগার্ড’ লেখা একটি বড় বোট আসে। ইউনিফর্ম পরা ৮-১০ জন সদস্য আমার ভাইয়ের সাথে ছবি ও ভিডিও করে তাকে নিয়ে চলে যায়। আমরা নদীর পাড়ে দাঁড়িয়ে সব দেখেছি।’মিরাজের স্ত্রী মুক্তা খাতুন জানান, সিসি’র (কন্টিনজেন্ট কমান্ডার) নম্বর নিয়ে ফোন দিলে তিনি শুরুতে স্বীকার করেছিলেন যে, মিরাজ তাদের কাছে আছে এবং তাকে ‘সন্দেহজনকভাবে’ আনা হয়েছে। কিন্তু পরদিন দিগরাজ অফিসে গেলে তারা অস্বীকার করেন।মুক্তা আরও বলেন, ‘আমরা স্বামীর খোঁজে মন্ত্রীর (প্রতিমন্ত্রী লায়ন ডক্টর শেখ ফরিদুল ইসলাম) কাছে ৬ বার গেছি। উনি আমাদের সামনে কোস্টগার্ডকে ফোন দিলে তারা জানায় কিছু জানে না। আমাদের একটাই দাবি, আমার স্বামী অপরাধী হলে সাজা দিক, কিন্তু ওরে এভাবে গুম করা কেন?’এদিকে স্বামীর কোনো হদিস না পেয়ে ২৩ এপ্রিল মোংলা থানায় জিডি করেন মুক্তা খাতুন। এরপর ৮ মে সংবাদ সম্মেলন এবং ১৪ মে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, পুলিশ আইজি ও কোস্টগার্ডের মহাপরিচালকসহ বিভিন্ন দফতরে লিখিত আবেদন করেন তিনি। আবেদনে তিনি উল্লেখ করেন, কোস্টগার্ডের কন্টিনজেন্ট কমান্ডার (সিসি) শুরুতে মিরাজ তাদের কাছে থাকার কথা স্বীকার করেছিলেন।কোস্টগার্ডের বক্তব্য ও লুকোচুরিশুরু থেকেই আটকের বিষয়টি অস্বীকার করে আসছেন কোস্টগার্ড পশ্চিম জোনের মিডিয়া অফিসার লেফটেন্যান্ট কমান্ডার মাহবুব হোসেন। এইচআরডব্লিউ এর বরাতে সংবাদমাধ্যমকে তিনি জানিয়েছেন, মিরাজ সম্পর্কে তাদের কাছে কোনো তথ্য নেই।হারবাড়িয়া স্টেশনের বর্তমান কন্টিনজেন্ট কমান্ডারের কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমি এখানে নতুন আসছি, এ বিষয়ে কিছুই বলতে পারব না।’ পরবর্তী সময়ে বিস্তারিত জানতে চাইলে তিনি ফোন কেটে দেন।মোংলা কোস্টগার্ড বেইসের গেট অফিসে দায়িত্বরত কর্মকর্তা সালমান জানান, এ বিষয়ে তথ্য জানতে সরাসরি অফিসে এসে কথা বলতে হবে।মোংলা থানার ওসি মো. আতিকুর রহমান ঢাকা মেইলকে বলেন, ‘নিখোঁজ জিডির পর থেকে আমরা মিরাজকে খোঁজাখুঁজি করছি। তবে সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য এখনো পাওয়া যায়নি। তদন্ত অব্যাহত আছে।’মিরাজের পরিবারকে হয়রানির অভিযোগনিখোঁজ মিরাজের সন্ধানের দাবিতে আন্দোলন করায় গত ৯ ও ১১ জুন গ্রামবাসীর সঙ্গে কোস্টগার্ডের সংঘাত হয়। লিজা ইসলামের অভিযোগ, ‘আমরা ভাইকে খুঁজছি বলে আমাদের গুমের হুমকি দেওয়া হয়েছে এবং মিথ্যা মামলায় জেল খাটানো হয়েছে।’গত ১১ জুন কোস্টগার্ডের পিও মো. শাহিনুর রহমান বাদী হয়ে মিরাজের স্ত্রী, অসুস্থ মা ও বোনসহ ৪৪ জনের নাম উল্লেখ করে এবং ৩০০ জন অজ্ঞাতনামা আসামির বিরুদ্ধে মামলা করেন। মামলায় ৯ লাখ ৮০ হাজার টাকার মালামাল চুরি ও ভাঙচুরের অভিযোগ আনা হয়। এই মামলায় মিরাজের পরিবারের তিন নারীসহ ১২ জনকে গ্রেফতার করা হয়। তারা টানা ২৭ দিন জেল খাটার পর জামিনে মুক্তি পান।কোস্টগার্ডের দাবি, উস্কানিমূলক স্লোগান দিয়ে দেশীয় অস্ত্রসহ গ্রামবাসীরা স্টেশনে হামলা চালায়, সিসিটিভি ইউনিট, ল্যাপটপ ও সোলার ব্যাটারি চুরি করে এবং সরকারি সম্পত্তির প্রায় ৯ লাখ ৮০ হাজার টাকার ক্ষতি করে। পরবর্তী সময়ে পুলিশের তদন্ত প্রতিবেদনে ক্ষতির পরিমাণ ২ কোটি ৩০ লাখ টাকা বলে উল্লেখ করা হয়।মিরাজের বোন লিজা ইসলাম অভিযোগ করেন, ‘আমাদের গ্রামে এখন কোনো পুরুষ মানুষ নেই, সবাই পলাতক। কোস্টগার্ড আমার অসুস্থ মা, ভাবি এবং আমাকে লাঠিপেটা করেছে। আমরা ভাইকে খুঁজতে গিয়েছি বলে আমাদের নামে মিথ্যা মামলা দিয়ে ২৭ দিন জেল খাটানো হয়েছে। তারা আমাদের রাত ৩টার সময় বাসায় এসে হুমকি দেয় যে মিরাজের মতো আমাদেরও গুম করে দেবে।’লিজা ইসলাম বলেন, ‘আমার বাবা প্যারালাইজড। আমরা তিন নারী ভাইকে খুঁজছি বলে আমাদের গুমের হুমকি দেওয়া হয়েছে এবং মিথ্যা মামলায় জেল খাটানো হয়েছে।’মিরাজের স্ত্রী মুক্তা বলেন, ‘যুদ্ধের সময়ের মতো অবস্থা! মানুষ কবরের ভেতর শুইয়া থাকে, পুরুষ বাড়িতে থাকে না। ওরা পিডন (পেটানো) দেয়।’কোস্টগার্ডের ওপর হামলার ঘটনায় করা মামলার তদন্ত কর্মকর্তা মোরশেদ মোল্যা বলেন, ‘তদন্ত অব্যাহত আছে। এখনো পুলিশ প্রতিবেদন দাখিল করা হয়নি। কোস্টগার্ড যে মামলাটি করেছে (১১ জুনের ঘটনা), তার প্রাথমিক সত্যতা পাওয়া গেছে। তবে গ্রামবাসীর দাবির বিষয়ে তদন্ত চলছে, তাই এখনই কোনো মন্তব্য করতে পারছি না। এই মামলায় ১০-১১ জন গ্রেফতার আছে, অধিকাংশ জামিনে বের হয়ে আসছে।’মানবাধিকার কর্মীর বক্তব্য ও উচ্চ আদালতের নির্দেশনামানবাধিকার কর্মী নূর খান এই ঘটনাকে ‘গুম’ হিসেবে আখ্যা দিয়ে বলেন, ‘৫ আগস্টের পর এমন ঘটনা দুঃখজনক। প্রকাশ্যে দিবালোকে কোস্টগার্ড মিরাজকে তুলে নিয়েছে। বিশ্বস্ত সূত্রে জানা গেছে, সে কোস্টগার্ড হেফাজতেই ছিল। এখন ঘটনা ধামাচাপা দেওয়ার জন্য ওই সময়ের সিসি বা ক্যাম্প কমান্ডারসহ অপারেশন সংশ্লিষ্ট সবাইকে বদলি করে দেওয়া হয়েছে। মিরাজকে বনদস্যু বা অস্ত্র পাচারকারী হিসেবে গুজব ছড়ানো হচ্ছে যাতে জনমনে নেতিবাচক ধারণা জন্মায়। হাইকোর্টের নির্দেশনা মোতাবেক জবাব না দিয়ে ডিফেন্ড করা সেই পূর্বের স্বৈরাচারী কার্যক্রমকেই মনে করিয়ে দেয়।’মিরাজের বাবা মোস্তফা শেখের হাইকোর্টে হেবিয়াস করপাস (বন্দীকে সশরীরে হাজির করা) রিট আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে গত ১২ জুলাই বিচারপতি আহমেদ সোহেল ও বিচারপতি ফাতেমা আনোয়ারের হাইকোর্ট বেঞ্চ নিখোঁজ মিরাজ শেখকে ১৫ দিনের মধ্যে সশরীরে আদালতে হাজির করার নির্দেশ দিয়েছেন।এদিকে ১৫ জুলাই হিউম্যান রাইটস ওয়াচ এক বিবৃতিতে এর স্বাধীন তদন্ত দাবি করে একে ‘গুম’ হিসেবে উল্লেখ করেছে। সংস্থাটির এশিয়া বিষয়ক উপপরিচালক মীনাক্ষী গাঙ্গুলী বলেন, ‘শেখ হাসিনার ১৫ বছরের শাসনামলে হাজার হাজার মানুষ গুমের শিকার হয়েছেন। সাম্প্রতিক ঘটনাটি প্রমাণ করে, কার্যকর প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার ছাড়া এসবের পুনরাবৃত্তি ঘটতেই থাকবে। এটা স্পষ্ট যে নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর রন্ধ্রে রন্ধ্রে এ ধরনের অপরাধমূলক চর্চা ঢুকে গেছে।’মীনাক্ষী গাঙ্গুলী বলেন, নতুন সরকার যেহেতু সংস্কারের প্রতিশ্রুতি দিয়ে ক্ষমতায় এসেছে, তাই তাদের উচিত বাহিনীর জবাবদিহি ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার নিশ্চিত করা।বর্তমানে গ্রেফতারের ভয়ে মিরাজের গ্রাম পুরুষশূন্য। মুক্তা খাতুন তার ৬ বছরের সন্তান নিয়ে বিচারের আশায় দ্বারে দ্বারে ঘুরছেন। বছরের সন্তানকে নিয়ে মুক্তা খাতুন এখন হাইকোর্টের নির্দেশের দিকে তাকিয়ে আছেন।
কপিরাইট © ২০২৬ বাংলা গ্লোবাল বুলেটিন । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত