প্রিন্ট এর তারিখ : ০৫ জুলাই ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ০৫ জুলাই ২০২৬
পেনাল্টির নাটকে শেষ ষোলো পার ফ্রান্সের, বিদায় প্যারাগুয়ের
অনলাইন ডেস্ক ||
তীব্র গরম, দুর্ভেদ্য রক্ষণভাগ আর অতিরিক্ত সময়ের রুদ্ধশ্বাস উত্তেজনা; সবকিছু পেরিয়ে অবশেষে ফিফা বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনাল নিশ্চিত করেছে ফ্রান্স। যুক্তরাষ্ট্রের ফিলাডেলফিয়ায় লিংকন ফিনান্সিয়াল ফিল্ড স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত শেষ ষোলোর ম্যাচে প্যারাগুয়েকে ১-০ গোলে হারিয়েছে দিদিয়ের দেশমের দল। একমাত্র গোলটি আসে অধিনায়ক কিলিয়ান এমবাপ্পের পেনাল্টি থেকে, যা এই ম্যাচের ভাগ্য নির্ধারণ করে দেয়।৩৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রার মধ্যে শুরু হয় ম্যাচ। শুরু থেকেই বল দখল ও আক্রমণে স্পষ্ট প্রাধান্য দেখায় ফ্রান্স। আক্রমণাত্মক ৪-২-৩-১ ফর্মেশনে খেলতে নামা দলটির কোচ দিদিয়ের দেশম মাঝমাঠে আদ্রিয়েন রাবিওর সঙ্গী হিসেবে মানু কোনোকে বেছে নেন। ফলে রিয়াল মাদ্রিদ মিডফিল্ডার অরেলিয়েন চুয়ামেনি শুরু করেন বদলি বেঞ্চ থেকে, যা ছিল ফরাসি একাদশের সবচেয়ে বড় চমক। অন্যদিকে পাঁচ ডিফেন্ডারের রক্ষণাত্মক কৌশল নিয়ে মাঠে নামে প্যারাগুয়ে। লক্ষ্য ছিল স্পষ্ট, রক্ষণ জমাট রেখে পাল্টা আক্রমণে সুযোগ খোঁজা।১৯ মিনিটে ম্যাচের প্রথম হলুদ কার্ড দেখেন ফ্রান্সের উইঙ্গার ব্র্যাডলি বারকোলা, বল দখলের লড়াইয়ে সময়জ্ঞান হারিয়ে অসতর্ক ট্যাকল করার জন্য। এরপর তীব্র গরমের কারণে ২৩ মিনিটে প্রথম হাইড্রেশন ব্রেক দেন রেফারি, যেখানে দুই দলের খেলোয়াড়রাই গলায় বরফ-ঠান্ডা তোয়ালে পেঁচিয়ে শরীর ঠান্ডা করার চেষ্টা করেন। ৩১ মিনিটে ম্যাচের সবচেয়ে উত্তেজনাকর মুহূর্তের জন্ম হয়। ডান প্রান্ত থেকে উসমান দেম্বেলের নিখুঁত ক্রস পেনাল্টি বক্সে পেয়ে প্রায় গোল করেই ফেলেছিলেন কিলিয়ান এমবাপ্পে। তবে একেবারে শেষ মুহূর্তে প্যারাগুয়ের ডিয়েগো গোমেজের সূক্ষ্ম কিন্তু কার্যকর ধাক্কায় ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেন ফরাসি অধিনায়ক, ফলে ঠিকমতো শট নিতে পারেননি তিনি। নিশ্চিত একটি গোল বাঁচিয়ে দেন গোমেজ, যা প্রথমার্ধে প্যারাগুয়ের রক্ষণের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত।প্রথমার্ধের শেষ দিকে আবারও আক্রমণ চালায় ফ্রান্স। আদ্রিয়েন রাবিওর দূরপাল্লার জোরালো শট প্যারাগুয়ে ডিফেন্ডাররা শরীর দিয়ে আটকে দেন। যোগ করা সময়সহ ৪৫+৪ মিনিট পর্যন্ত গড়ানো প্রথমার্ধে কোনো দলই জালের দেখা না পাওয়ায় গোলশূন্য অবস্থায় বিরতিতে যায় দুই দল। প্রথমার্ধের পরিসংখ্যান স্পষ্ট করে দেয়, বল দখল ও আক্রমণের ধারে সম্পূর্ণ আধিপত্য ছিল ফরাসিদের, তবে ফিনিশিংয়ে তাদের ব্যর্থতা এবং প্যারাগুয়ের আত্মত্যাগী রক্ষণই স্কোরলাইন গোলশূন্য রাখতে মূল ভূমিকা রাখে।বিরতির পর নতুন উদ্যমে মাঠে ফেরে দুই দল। ৫৫ মিনিটে দূরপাল্লা থেকে মানু কোনোর জোরালো শট জালের ছাদে জড়িয়ে যাচ্ছিল বলে মনে হলেও প্যারাগুয়ের গোলরক্ষক কার্লোস করোনেল অসাধারণ ক্ষিপ্রতায় ঝাঁপিয়ে পড়ে এক হাতের আঙুলের স্পর্শে বলটি ক্রসবারের ওপর দিয়ে বাইরে পাঠিয়ে দেন। ম্যাচের অন্যতম সেরা এই সেভে দলকে নিশ্চিত গোল খাওয়া থেকে বাঁচান তিনি।তবে ৬৬ মিনিটে আর রক্ষা হয়নি প্যারাগুয়ের। পেনাল্টি বক্সের ভেতরে ফরাসি এক আক্রমণভাগের খেলোয়াড়কে ফাউল করেন প্যারাগুয়ের এক ডিফেন্ডার, সঙ্গে সঙ্গে স্পট-কিকের বাঁশি বাজান রেফারি। ফাউলটি স্পষ্ট ছিল বলেই প্যারাগুয়ের খেলোয়াড়দের কাছ থেকে তেমন কোনো প্রতিবাদ দেখা যায়নি। চার মিনিট পর ৭০ মিনিটে প্রবল চাপের মধ্যেও দারুণ স্থিরতা দেখিয়ে স্পট-কিক থেকে গোল করেন কিলিয়ান এমবাপ্পে। শটের দিক ভুল বুঝে উল্টো দিকে ঝাঁপ দেন প্যারাগুয়ের গোলরক্ষক কার্লোস করোনেল, আর নিখুঁত শটে বল জালে জড়িয়ে দলকে এগিয়ে নেন ফরাসি অধিনায়ক।এই গোলের মাধ্যমে বিশেষ এক মাইলফলক স্পর্শ করেন এমবাপ্পে। চলতি বিশ্বকাপে গোলসংখ্যায় লিওনেল মেসিকে ছুঁয়ে ফেলেন তিনি; দুজনেরই এখন সাতটি করে গোল। এছাড়া বিশ্বকাপের ইতিহাসে সর্বোচ্চ গোলদাতাদের তালিকায় মেসির ২০ গোলের রেকর্ড থেকে এখন মাত্র এক গোল দূরে অবস্থান করছেন ফরাসি অধিনায়ক।গোল হজমের পর ৭৩ মিনিটে দ্বিতীয়ার্ধের হাইড্রেশন ব্রেকের সময় নেওয়া হয়। ৮১ মিনিটে হুলিও এনসিসোকে কঠোর ট্যাকলে ফেলার জন্য হলুদ কার্ড দেখেন ফ্রান্সের মানু কোনো। এই সিদ্ধান্ত নিয়ে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া দেখায় ফরাসি বেঞ্চ, তাদের দাবি ছিল প্যারাগুয়ের একজন ডিফেন্ডার ম্যাচজুড়ে একাধিক কঠোর ট্যাকল করেও তখনও কোনো কার্ড দেখেননি।নির্ধারিত ৯০ মিনিট শেষে চতুর্থ রেফারি যোগ করেন ১০ মিনিট অতিরিক্ত সময়। এই সময়ে সমতায় ফেরার সবচেয়ে বড় সুযোগ পায় প্যারাগুয়ে। পেনাল্টি বক্সের বাইরে থেকে মৌরিসিওর নেওয়া শক্তিশালী নিচু শট অসাধারণ ক্ষিপ্রতায় ঝাঁপিয়ে পড়ে ফিরিয়ে দেন ফ্রান্সের গোলরক্ষক মাইক মেইনিয়ান। এই সেভ ছিল ফ্রান্সের জয় নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এরপর অতিরিক্ত সময়ের ৭ মিনিটে রেফারির এক সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ জানিয়ে হলুদ কার্ড দেখেন ফ্রান্সের মাইকেল ওলিজে, যা শেষ মুহূর্তের চাপা উত্তেজনার প্রতিফলন। অবশেষে অতিরিক্ত সময়ের ১১ মিনিটে শেষ বাঁশি বাজান রেফারি।পুরো ম্যাচজুড়ে বল দখল ও আক্রমণে স্পষ্ট আধিপত্য ছিল ফ্রান্সের। ম্যাচে মোট তিনটি হলুদ কার্ড দেখে ফ্রান্স (বারকোলা, কোনো, ওলিজে), প্যারাগুয়ের কোনো খেলোয়াড় কার্ড দেখেননি। কোনো লাল কার্ডও দেখানো হয়নি। ম্যাচে একটি পেনাল্টি পায় ফ্রান্স, যেখান থেকেই আসে জয়সূচক গোল; প্যারাগুয়ে কোনো পেনাল্টি পায়নি। রক্ষণে উইলিয়াম সালিবা ও দায়ো উপামেকানোর জুটি এবং গোলবারের নিচে মাইক মেইনিয়ানের নির্ভরযোগ্যতা ফ্রান্সকে ক্লিন শিট রাখতে সহায়তা করে।গ্রুপ পর্বে শীর্ষে থেকে এবং রাউন্ড অব ৩২-এ সুইডেনকে ৩-০ গোলে উড়িয়ে দিয়ে শেষ ষোলোতে ওঠা ফ্রান্স টুর্নামেন্টজুড়েই রয়েছে দুর্দান্ত ছন্দে। এই জয়ে তারা নিশ্চিত করল কোয়ার্টার ফাইনালের টিকিট। অন্যদিকে আগের রাউন্ডে জার্মানিকে টাইব্রেকারে হারিয়ে চমক দেখানো প্যারাগুয়ের বিশ্বকাপ যাত্রা থামল শেষ ষোলোতেই, তবে শক্তিশালী ফ্রান্সের বিপক্ষে দীর্ঘ সময় প্রতিরোধ গড়ে রাখা তাদের জন্য গর্বের বিষয় হয়েই থাকবে।কোয়ার্টার ফাইনালে ফ্রান্সের প্রতিপক্ষ হবে মরক্কো, যারা আগেই কানাডাকে ৩-০ গোলে হারিয়ে শেষ আট নিশ্চিত করেছে। আগামী ৯ জুলাই বোস্টনে অনুষ্ঠিত হবে এই হাইভোল্টেজ লড়াই।
কপিরাইট © ২০২৬ বাংলা গ্লোবাল বুলেটিন । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত