প্রিন্ট এর তারিখ : ৩০ জুন ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ৩০ জুন ২০২৬
সংসদে আদালতের ব্যান্ড পরে রুমিন, আইনি অবস্থান ব্যাখ্যা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর
অনলাইন ডেস্ক ||
বাজেট অধিবেশনে সাধারণত আইন-শৃঙ্খলা, অপরাধের পরিসংখ্যান ও বাজেট বরাদ্দ নিয়ে উত্তপ্ত বাক্যবিনিময় হলেও, এবার তার সঙ্গে যুক্ত হলো আদালতের পোশাকের একটি বিশেষ অংশ।আদালতে আইনজীবীদের ব্যবহৃত বিশেষ ব্যান্ড পরে সংসদ অধিবেশনে অংশ নেন রুমিন ফারহানা। বক্তব্য দেওয়ার শুরুতেই তিনি নিজেই এই পোশাকের বিষয়ে স্পিকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন।মঙ্গলবার (৩০ জুন) জাতীয় সংসদে ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামালের সভাপতিত্বে ছাঁটাই প্রস্তাবের আলোচনায় অংশ নিয়ে তিনি এসব কথা বলেন।রুমিন ফারহানা বলেন, আদালতের বাইরে এই বিশেষ ব্যান্ড পরা যায় না তা তিনি একজন আইনের শিক্ষার্থী ও আইনজীবী হিসেবে খুব ভালো করেই জানেন। তবে কোনো বিশেষ পরিস্থিতিতে এবং কেন তিনি এটি পরে সংসদে এসেছেন, তা স্পিকার নিশ্চয়ই বুঝতে পারছেন বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বাজেট বরাদ্দের তীব্র বিরোধিতা এবং দেশের বর্তমান নিরাপত্তা পরিস্থিতির সমালোচনা করার অংশ হিসেবেই তিনি এই বিশেষ পোশাকের প্রসঙ্গটি টেনে আনেন এবং মন্ত্রণালয়ের বরাদ্দ ছাঁটাই করে মাত্র ১ টাকা করার দাবি জানান।রুমিন ফারহানা তার বক্তব্যে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জন্য প্রস্তাবিত ৩১ হাজার ৯৮ কোটি ৮৮ লাখ ১৫ হাজার টাকা বরাদ্দের কঠোর সমালোচনা করেন। তিনি দেশের সাম্প্রতিক অপরাধের কিছু খতিয়ান তুলে ধরে বলেন, মার্চ ও এপ্রিল এই দুই মাসেই সারা দেশে রেকর্ড ৬০৫টি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। একই সময়ে ২৯৪টি ছিনতাই, ৯০টি ডাকাতি, ১৯৬টি অপহরণ, ২২১৪টি চুরি এবং ১২৯টি পুলিশ আক্রান্ত হওয়ার ঘটনা ঘটেছে। এ ছাড়া নারী ও শিশু নির্যাতনের ৩ হাজার ৪৯৬টি মামলা নথিভুক্ত হয়েছে।দেশের সংবাদমাধ্যমের বরাত দিয়ে তিনি জানান, সারা দেশে প্রতিদিন গড়ে ১০টির বেশি খুনের ঘটনা ঘটছে। দেশের আইন-শৃঙ্খলা ও নিরাপত্তার এমন নাজুক পরিস্থিতির মধ্যে এই মন্ত্রণালয়ের জন্য বিপুল পরিমাণ বাজেট বরাদ্দের যৌক্তিকতা নিয়ে তিনি প্রশ্ন তোলেন।রসাত্মক সুর মিলিয়ে তিনি বলেন, পুরো বাজেটের সবটাই যদি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে দেওয়া হয়, তারপরেও এই মন্ত্রণালয়ের কতটুকু উন্নয়ন হবে তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। তবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্যের ভূয়সী প্রশংসা করে তিনি বলেন, তিনি নিজেও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ডিবেট মুগ্ধ হয়ে শোনেন, কিন্তু এই মুগ্ধতা যদি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী তার কাজের মাধ্যমে পুরো মন্ত্রণালয়ে ছড়িয়ে দিতে পারতেন, তাহলে হয়ত আজ ছাঁটাই প্রস্তাব আনার প্রয়োজন হতো না।রুমিন ফারহানার বক্তব্যের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাউদ্দিন আহমেদ রুমিন ফারহানার পোশাক পরিধানের বিষয়ে আইনি, সাংবিধানিক ও সংসদীয় অবস্থান পরিষ্কার করেন। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সংসদের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ও সংসদ সদস্য জয়নুল আবেদীনের মতামতের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করে জানান যে, সংসদের ভেতরে বাইরের কোনো আদালতের বিধি-বিধান কার্যকর হয় না। সংসদ সম্পূর্ণভাবে নিজস্ব কার্যপ্রণালী বিধি বা রুলস অব প্রসিডিউর অনুযায়ী পরিচালিত হয়, যা প্রণয়নের পূর্ণ ক্ষমতা দেশের সংবিধান সরাসরি এই সার্বভৌম হাউসকে দিয়েছে।তিনি স্পষ্ট করে বলেন, সংসদের কার্যপ্রণালী বিধিতে কোনো নির্দিষ্ট পোশাক পরিধান করে প্রবেশ করা যাবে না বা যাবে, এমন কোনো নিষেধাজ্ঞা বা বাধ্যবাধকতা চাপানো নেই। জেনারেল ক্লজেস অ্যাক্টের প্রসঙ্গ টেনে হাস্যরসের সৃষ্টি করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, আইনজীবীদের ভাষায় ‘শি ইনক্লুডস হি’। তিনি রুমিন ফারহানার পোশাকটিকে অত্যন্ত ‘শোভন পোশাক’ হিসেবে আখ্যায়িত করে বলেন, সংসদে নিজের পছন্দমতো পোশাক পরিধানের পূর্ণ স্বাধীনতা ওই নারী সংসদ সদস্যের রয়েছে।পোশাকের স্বাধীনতার বিষয়ে কথা বলতে গিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রাষ্ট্র পরিচালনার অন্যতম প্রধান স্তম্ভ ক্ষমতার পৃথকীকরণ নীতির ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করেন। তিনি উল্লেখ করেন, সুপ্রিম কোর্টের বা বিচার বিভাগের নিজস্ব নিয়ম বা রুলস তৈরির পূর্ণ অধিকার রয়েছে এবং সেটি তাদের নিজস্ব জুরিসডিকশনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে। কিন্তু ক্ষমতার পৃথকীকরণ নীতি অনুযায়ী আইনসভা ও বিচার বিভাগ একে অপরের ওপর কোনো সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দিতে বা কোনো ডিক্টেট করতে পারে না, কিংবা একে অপরের ওপর ওভারল্যাপিং করতে পারে না। নিজে প্র্যাকটিসিং লয়ার না হওয়া সত্ত্বেও কিছুটা জুরিসডিকশন ক্রস করে এই ব্যাখ্যা দেওয়ার জন্য তিনি হেসে দুঃখ প্রকাশ করেন।একই সঙ্গে রুমিন ফারহানা তার বক্তব্যের প্রশংসা করায় তিনি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন এবং বলেন, দেশের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি কীভাবে উন্নত হয়েছে তা তিনি আগের দিনই ক্রাইম রিপোর্টসহ খাতওয়ারি বর্ণনা দিয়েছিলেন, যা সম্ভবত রুমিন ফারহানা শুনতে পাননি।স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী দাবি করেন, বিগত ১০-১৫ বছরের ঐতিহাসিক ডেটা পর্যালোচনা করলে দেখা যাবে যে বর্তমান সরকার দায়িত্ব আসার পর থেকে খুন, ডাকাতিসহ সমস্ত সামাজিক অপরাধের সূচকে দেশ অনেক উন্নত অবস্থানে আছে। তবে ধর্ষণের মামলা বাড়ার কারণ হিসেবে তিনি ব্যাখ্যা করেন যে, আগে সামাজিক বা রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের কারণে ধর্ষিতারা থানায় যেত না, কিন্তু এখন অনলাইনে জিডি ও এফআইআর দাখিলের সুবর্ণ সুযোগ থাকায় এবং কোনো ইন্টারফেয়ারেন্স না থাকায় মামলার সংখ্যা বেড়েছে, যা আসলে অপরাধ দমনে সচেতনতারই বহিঃপ্রকাশ।
কপিরাইট © ২০২৬ বাংলা গ্লোবাল বুলেটিন । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত