প্রিন্ট এর তারিখ : ২০ জুন ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ২০ জুন ২০২৬
মুতা বিয়ে কী, কেন নিষিদ্ধ হলো ইসলামে?
অনলাইন ডেস্ক ||
মুতা বিয়ে কী?মুতা বিয়ে বা অস্থায়ী বিয়ে হলো এমন এক ধরনের বিয়ে, যেখানে উভয় পক্ষ একটি নির্দিষ্ট সময়ের জন্য পরস্পরের শারীরিক তৃপ্তি বা উপভোগের উদ্দেশ্যে বিয়ে করে। এ ধরনের বিয়ে জাহেলি যুগ অর্থাৎ ইসলাম-পূর্ব যুগে আরবে প্রচলিত ছিল।ইসলাম যখন এলো, তখন যেমন মদ্যপান ধাপে ধাপে নিষিদ্ধ হয়, মুতা বিয়েও ধাপে ধাপে নিষিদ্ধ হয়। ইসলামের প্রাথমিক যুগে নিরুপায় অবস্থায় বা তীব্র প্রয়োজনের সময় এ রকম বিয়ের অনুমতি দেওয়া হয়েছিল। পুরুষদের দীর্ঘ সামরিক অভিযান বা যুদ্ধযাত্রার সফরে থাকা এবং নারীদের থেকে দূরে থাকার কারণে ধৈর্য ধারণ করতে না পারার মতো পরিস্থিতিতে এই সাময়িক ছাড় দেওয়া হয়েছিল।পরবর্তীতে রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) সব ধরনের পরিস্থিতিতে এটিকে চিরতরে হারাম বা নিষিদ্ধ করে দেন।মুতা বিয়ের বিধানমুতা বিয়ের বিধান সম্পর্কে প্রখ্যাত ইসলামি চিন্তাবিদ ড. ইউসুফ কারযাভী (রহ.) বলেন:ইসলামে বিয়ে হলো একটি সুদৃঢ় বন্ধন এবং অত্যন্ত মজবুত অঙ্গীকার। এটি উভয় পক্ষের আজীবন একসাথে বসবাস করার নিয়তের ওপর প্রতিষ্ঠিত হয় যেন কোরআনে বর্ণিত মানসিক প্রশান্তি, সৌহার্দ্য ও রহমত অর্জিত হয়। সেই সাথে বংশবিস্তারের মতো গঠনমূলক লক্ষ্যও এর দ্বারা পূরণ হয়।আল্লাহ তাআলা বলেন, আর আল্লাহ তোমাদের জন্য তোমাদের থেকে জোড়া সৃষ্টি করেছেন এবং তোমাদের জোড়া থেকে তোমাদের জন্য পুত্র ও নাতিদের সৃষ্টি করেছেন আর তিনি তোমাদের পবিত্র রিজিক দান করেছেন তারা কি বাতিলে বিশ্বাস করে এবং আল্লাহর নিআমতকে অস্বীকার করে? (সুরা নাহল: ৭২)মুতা বিয়ে যা নির্দিষ্ট অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে পুরুষ ও নারীর মধ্যে নিজেদের নির্ধারিত মেয়াদের একটি চুক্তি মাত্র, তাতে উল্লিখিত লক্ষ্যগুলো অর্জিত হয় না। ইসলামি শরিয়তের বিধান পূর্ণাঙ্গ রূপ নেওয়ার আগে রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর অনুমতি দিয়েছিলেন। তিনি কেবল সফর ও যুদ্ধকালীন পরিস্থিতিতে এর অনুমতি দেন, অতঃপর তা থেকে নিষেধ করেন এবং চিরতরের জন্য তা হারাম ঘোষণা করেন।শুরুতে এটি বৈধ করার রহস্য ছিল এই যে, সেই সময় সমাজ জাহেলিয়াত থেকে ইসলামের দিকে অগ্রসর হওয়ার একটি ‘অন্তর্বর্তীকালীন পর্যায়’ অতিক্রম করছিল। জাহেলি যুগে ব্যভিচার অত্যন্ত সহজ ও ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছিল। যখন ইসলাম এলো এবং দ্বীনের খাতিরে তাদের যুদ্ধ ও জিহাদের সফরে যেতে হলো, তখন স্ত্রীদের থেকে দীর্ঘ সময় দূরে থাকা তাদের জন্য অত্যন্ত কষ্টকর হয়ে দাঁড়াল। তাদের মধ্যে যেমন মজবুত ইমানের অধিকারী মানুষ ছিলেন, তেমনি দুর্বল ইমানের মানুষও ছিলেন। দুর্বলদের ক্ষেত্রে আশঙ্কা ছিল যে তারা হয়তো ব্যভিচারের মতো নিকৃষ্ট ও জঘন্য পাপে লিপ্ত হয়ে পড়তে পারে।আর মজবুত ইমানদারদের অবস্থা এমন হয়েছিল যে, তারা নিজেদের অণ্ডকোষ কেটে ফেলা বা পুরুষত্বহীন করে ফেলার কথা ভেবেছিলেন। যেমন আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) বর্ণনা করেছেন, ‘আমরা রাসুলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সঙ্গে যুদ্ধে যেতাম এবং আমাদের সাথে কোনো নারী থাকত না। আমরা বললাম: আমরা কি নিজেদের খাসি করে নেব অর্থাৎ নিজেদের অণ্ডকোষ কেটে ফেলবো? রাসুলুল্লাহ (সা.) আমাদের তা করতে নিষেধ করলেন এবং একটি কাপড়ের বিনিময়ে নির্দিষ্ট মেয়াদের জন্য কোনো নারীকে বিয়ে করার অনুমতি দিলেন।’সুতরাং, দুর্বল ও সবল উভয় পক্ষের সমস্যা সমাধানের জন্য একটি সাময়িক ছাড় হিসেবে মুতা বিয়ের এই অনুমতি দেওয়া হয়েছিল।কোরআন যেভাবে মদ ও সুদ—যেগুলো জাহেলি যুগে ব্যাপকভাবে প্রচলিত ছিল—ধাপে ধাপে হারাম করেছে, ঠিক একইভাবে নবীজি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামও) যৌন সম্পর্কের বিধান ক্রমান্বয়ে হারাম বা সংস্কারের দিকে নিয়ে গেছেন। তিনি জরুরি প্রয়োজনে প্রথমে মুতা বিয়ের অনুমতি দেন, অতঃপর এ ধরনের বিয়েকে নিষিদ্ধ করেন।হযরত আলীসহ (রা.) একদল সাহাবি এই নিষেধাজ্ঞা বর্ণনা করেছেন। ইমাম মুসলিম তার ‘সহীহ’ গ্রন্থে সাবরা আল-জুহানী (রা.) থেকে বর্ণনা করেছেন যে, ‘তিনি মক্কা বিজয়ের সময় নবীজির (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সঙ্গে যুদ্ধ করেছিলেন, তখন নবীজি (সা.) মুতা বিয়ের অনুমতি দেন। বর্ণনাকারী বলেন, তিনি সেখান থেকে বের হওয়ার আগেই রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আবার তা হারাম করে দেন।’ অন্য একটি বর্ণনায় এসেছে, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ তা কিয়ামতের দিন পর্যন্ত হারাম করে দিয়েছেন।’তবে প্রশ্ন থাকে যে, এই নিষেধাজ্ঞা কি মা ও বোনদের বিয়ে করার মতো চিরস্থায়ী ও চূড়ান্ত নিষেধাজ্ঞা, নাকি এটি মৃত জন্তু, রক্ত ও শূকরের মাংসের মতো নিষেধাজ্ঞা, যা তীব্র প্রয়োজনের সময় নিরুপায় অবস্থায় বা ব্যভিচারে লিপ্ত হওয়ার নিশ্চিত ভয়ের সময় বৈধ হয়?অধিকাংশ সাহাবির মতে, শরিয়তের বিধান স্থিতিশীল হওয়ার পর এটি একটি চূড়ান্ত ও সুনির্দিষ্ট নিষেধাজ্ঞা, যাতে আর কোনো ছাড়ের সুযোগ নেই। তবে আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) এর ব্যতিক্রম মত পোষণ করতেন। তিনি মনে করতেন, তীব্র প্রয়োজনে এটি বৈধ হতে পারে। এক ব্যক্তি তাঁকে মুতা বিয়ে সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলে তিনি তাকে অনুমতি দেন। তখন তাঁর এক মুক্ত দাস জিজ্ঞেস করল, এটি কি কেবল তীব্র সংকটের মুহূর্তে বৈধ? ইবনে আব্বাস (রা.) বললেন: হ্যাঁ।পরবর্তীতে যখন ইবনে আব্বাসের (রা.) কাছে স্পষ্ট হলো যে, মানুষ এই ফতোয়া নিয়ে যথেচ্ছাচার শুরু করেছে এবং কেবল জরুরি প্রয়োজনের মাঝে সীমাবদ্ধ থাকছে না, তখন তিনি এই মত থেকে ফিরে আসেন।সূত্র: ইসলাম অনলাইন
কপিরাইট © ২০২৬ বাংলা গ্লোবাল বুলেটিন । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত