প্রিন্ট এর তারিখ : ০৯ মে ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ০৯ মে ২০২৬
‘পকেটের ব্যাংক’ হয়ে উঠছে ক্রেডিট কার্ড
অনলাইন ডেস্ক ||
এক সময় ক্রেডিট কার্ড ছিল কেবল উচ্চবিত্ত বা অভিজাত শ্রেণির ব্যবহৃত একটি আর্থিক পণ্য। ব্যাংকের বিশেষ গ্রাহক, বড় ব্যবসায়ী কিংবা বিদেশ ভ্রমণকারীদের মধ্যেই এর ব্যবহার সীমাবদ্ধ ছিল। কিন্তু সময় বদলেছে। এখন শহর থেকে মফস্বল— সর্বত্রই ক্রেডিট কার্ড হয়ে উঠছে দৈনন্দিন জীবনের গুরুত্বপূর্ণ সঙ্গী। বাজার করা, হাসপাতালের বিল, অনলাইন কেনাকাটা, বিমান টিকিট, রেস্টুরেন্ট বিল, শিক্ষা খরচ, এমনকি ইউটিলিটি বিল পরিশোধেও বাড়ছে কার্ডের ব্যবহার।বাংলাদেশে দ্রুত প্রসারমান ডিজিটাল অর্থনীতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে ক্রেডিট কার্ড এখন অনেকের কাছে ‘বিকল্প নগদ অর্থ’। বিশেষ করে মধ্যবিত্ত ও তরুণ প্রজন্মের মধ্যে এর জনপ্রিয়তা সবচেয়ে বেশি বাড়ছে। ব্যাংকগুলোও গ্রাহক টানতে দিচ্ছে ক্যাশব্যাক, ইএমআই, ডিসকাউন্ট, এয়ারপোর্ট লাউঞ্জ সুবিধা থেকে শুরু করে আন্তর্জাতিক লেনদেনের সুযোগ।এই বাস্তবতায় বাংলাদেশ ব্যাংকও ক্রেডিট কার্ড ব্যবস্থাকে আরও সম্প্রসারণ ও আধুনিক করতে বড় ধরনের পরিবর্তন এনেছে। নতুন নীতিমালায় ক্রেডিট কার্ডে ঋণের সীমা দ্বিগুণ বাড়িয়ে সর্বোচ্চ ৪০ লাখ টাকা পর্যন্ত করা হয়েছে। একইসঙ্গে গ্রাহক সুরক্ষা, সুদের স্বচ্ছতা ও ডিজিটাল নিরাপত্তার বিষয়েও কঠোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।৪০ লাখ টাকা পর্যন্ত ঋণের সুযোগবাংলাদেশ ব্যাংকের নতুন নীতিমালা অনুযায়ী, এখন জামানত ছাড়া ক্রেডিট কার্ডে সর্বোচ্চ ২০ লাখ টাকা এবং জামানতের বিপরীতে সর্বোচ্চ ৪০ লাখ টাকা পর্যন্ত ঋণ পাওয়া যাবে। আগে এই সীমা ছিল যথাক্রমে ১০ লাখ ও ২০ লাখ টাকা।সংশ্লিষ্টরা বলছেন, উচ্চমূল্যের চিকিৎসা, বিদেশে শিক্ষা ব্যয়, ব্যবসায়িক সফর কিংবা জরুরি খরচ মেটাতে এই সিদ্ধান্ত অনেক গ্রাহকের জন্য বড় সহায়তা হবে। একইসঙ্গে দেশের ক্যাশলেস অর্থনীতি সম্প্রসারণেও এটি ভূমিকা রাখবে।নীতিমালায় আরও বলা হয়েছে, কার্ডধারীরা তাদের মোট ক্রেডিট সীমার সর্বোচ্চ ৫০ শতাংশ পর্যন্ত নগদ অর্থ উত্তোলন করতে পারবেন। তবে নগদ উত্তোলনের ক্ষেত্রে গ্রেস পিরিয়ড সুবিধা প্রযোজ্য হবে না।সুদ ছাড়াই ৪৫ দিন পর্যন্ত খরচের সুযোগক্রেডিট কার্ডের সবচেয়ে বড় সুবিধাগুলোর একটি হলো ‘গ্রেস পিরিয়ড’। অর্থাৎ কার্ড ব্যবহার করে কেনাকাটা করার পর সঙ্গে সঙ্গে বিল পরিশোধ করতে হয় না। ব্যাংকভেদে ৪৫ দিন পর্যন্ত সময় পাওয়া যায়, যেখানে কোনও সুদ গুনতে হয় না।অর্থাৎ নির্ধারিত সময়ের মধ্যে পুরো বিল পরিশোধ করতে পারলে গ্রাহক কার্যত সুদমুক্ত স্বল্পমেয়াদি ঋণের সুবিধা পান। ফলে হঠাৎ আর্থিক চাপ সামাল দেওয়া অনেক সহজ হয়ে যায়।ব্যাংকাররা বলছেন, পরিকল্পিতভাবে ব্যবহার করলে ক্রেডিট কার্ড একজন মানুষের ব্যক্তিগত অর্থ ব্যবস্থাপনাকে আরও শৃঙ্খলিত করে। বিশেষ করে বেতনভিত্তিক চাকরিজীবী ও তরুণ উদ্যোক্তাদের জন্য এটি কার্যকর আর্থিক সহায়ক হিসেবে কাজ করছে।সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় বড় পরিবর্তনদেশে গত এক দশকে মোবাইল ব্যাংকিং, ইন্টারনেট ব্যাংকিং ও অ্যাপভিত্তিক লেনদেন বাড়লেও কার্ডের ব্যবহারও দ্রুত বৃদ্ধি পেয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে দেশে ডেবিট, ক্রেডিট ও প্রিপেইড মিলিয়ে ৫ কোটির বেশি কার্ড চালু রয়েছে। শুধু ক্রেডিট কার্ডই আছে প্রায় ৫৪ লাখ।প্রতি মাসে গড়ে ৩ হাজার কোটি টাকার বেশি লেনদেন হচ্ছে ক্রেডিট কার্ডে। সাম্প্রতিক মাসগুলোতে এই অঙ্ক ৩ হাজার ৫০০ কোটিও ছাড়িয়েছে।বিশ্লেষণে দেখা গেছে, দেশের অভ্যন্তরে ক্রেডিট কার্ডে সবচেয়ে বেশি খরচ হচ্ছে ডিপার্টমেন্টাল স্টোর, সুপারশপ ও খুচরা বিক্রয়কেন্দ্রে। এরপর রয়েছে ইউটিলিটি বিল, ওষুধ, পোশাক, পরিবহন ও সরকারি সেবা খাত।অন্যদিকে বিদেশে বাংলাদেশিরা সবচেয়ে বেশি কার্ড ব্যবহার করছেন ডিপার্টমেন্টাল স্টোর, খুচরা দোকান, যাতায়াত ও শিক্ষা-সম্পর্কিত খরচে।বিদেশে ডেবিট কার্ডের ব্যবহারও বাড়ছেএক সময় বিদেশে বাংলাদেশিদের লেনদেনে ক্রেডিট কার্ডই ছিল প্রধান মাধ্যম। এখন সেই জায়গায় দ্রুত জনপ্রিয় হচ্ছে ডুয়াল কারেন্সি ডেবিট কার্ডও।বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, বিদেশে বাংলাদেশি ডেবিট কার্ডে সবচেয়ে বেশি লেনদেন হচ্ছে যুক্তরাজ্যে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশটিতে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীর সংখ্যা বেশি হওয়ায় এই প্রবণতা তৈরি হয়েছে। পরিবারের সদস্যরা দেশে টাকা জমা দিলেই বিদেশে থাকা শিক্ষার্থীরা সহজে কার্ড ব্যবহার করতে পারছেন।ক্রেডিট কার্ডের তুলনায় ডেবিট কার্ডে সুদের ঝুঁকি না থাকায় অনেকেই এখন এদিকে ঝুঁকছেন।নিরাপত্তায় নতুন প্রযুক্তিডিজিটাল লেনদেন বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাড়ছে জালিয়াতির ঝুঁকিও। এ কারণে ব্যাংকগুলো এখন নিরাপত্তা ব্যবস্থায় বড় ধরনের পরিবর্তন আনছে।সম্প্রতি দেশে প্রথমবারের মতো নম্বরবিহীন ডেবিট কার্ড চালু করেছে মাস্টারকার্ড ও প্রাইম ব্যাংক। এই কার্ডে দৃশ্যমান কোনও কার্ড নম্বর, সিভিভি বা মেয়াদোত্তীর্ণের তথ্য থাকবে না। সব তথ্য সংরক্ষিত থাকবে মোবাইল অ্যাপে।এছাড়া এখন অধিকাংশ ব্যাংক ওটিপি, বায়োমেট্রিক নিরাপত্তা, অ্যাপভিত্তিক নিয়ন্ত্রণ, তাৎক্ষণিক কার্ড ব্লক ও রিয়েল-টাইম নোটিফিকেশন সুবিধা দিচ্ছে।বাংলাদেশ ব্যাংকও নতুন নীতিমালায় স্পষ্টভাবে বলেছে, কার্ড হারিয়ে গেলে বা জালিয়াতির শঙ্কা তৈরি হলে ২৪ ঘণ্টার হেল্পলাইন চালু রাখতে হবে। পাশাপাশি গ্রাহকদের হয়রানি করে ঋণ আদায়ও করা যাবে না।ইসলামিক ক্রেডিট কার্ডেও বাড়ছে আগ্রহদেশে শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংকিং সম্প্রসারণের সঙ্গে সঙ্গে ইসলামিক ক্রেডিট কার্ডের জনপ্রিয়তাও বাড়ছে। এসব কার্ডে প্রচলিত সুদের পরিবর্তে নির্ধারিত সার্ভিস চার্জ বা উজরাহ পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়।বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ধর্মীয় মূল্যবোধ বজায় রেখেও আধুনিক ডিজিটাল আর্থিক সুবিধা গ্রহণের সুযোগ থাকায় তরুণদের মধ্যেও ইসলামিক কার্ডের চাহিদা বাড়ছে।শিক্ষার্থী ও ফ্রিল্যান্সারদের জন্য বিশেষ কার্ডএখন শুধু চাকরিজীবী বা ব্যবসায়ীরাই নন, শিক্ষার্থী ও ফ্রিল্যান্সারদের জন্যও বিশেষ ধরনের কার্ড চালু করছে ব্যাংকগুলো।সম্প্রতি সাউথইস্ট ব্যাংক শিক্ষার্থীদের জন্য ‘ভিসা স্টুডেন্ট ক্রেডিট কার্ড’ চালু করেছে। অভিভাবকের গ্যারান্টিতে শিক্ষার্থীরা এই কার্ড ব্যবহার করতে পারবে।অন্যদিকে ফ্রিল্যান্সারদের জন্য ডুয়াল কারেন্সি সুবিধাসহ বিশেষ কার্ড দিচ্ছে বিভিন্ন ব্যাংক। এসব কার্ড দিয়ে বিদেশি সফটওয়্যার, ক্লাউড সার্ভিস, অনলাইন সাবস্ক্রিপশন কিংবা আন্তর্জাতিক পেমেন্ট সহজে করা যাচ্ছে।তবে সতর্কতাও জরুরিবিশেষজ্ঞরা বলছেন, পরিকল্পনা ছাড়া ক্রেডিট কার্ড ব্যবহার করলে এটি আর্থিক চাপের কারণও হতে পারে। কারণ সময়মতো বিল পরিশোধ না করলে উচ্চ সুদ যোগ হয় এবং দেনা দ্রুত বাড়তে থাকে।বিশেষ করে ‘মিনিমাম পেমেন্ট’ দিয়ে দীর্ঘ সময় বকেয়া রাখলে সুদের বোঝা কয়েক গুণ বেড়ে যেতে পারে।তাই প্রয়োজন ছাড়া অতিরিক্ত খরচ না করা, নির্ধারিত সময়ে বিল পরিশোধ, ওটিপি বা পিন কারও সঙ্গে শেয়ার না করা এবং নিয়মিত স্টেটমেন্ট যাচাই করার পরামর্শ দিয়েছেন ব্যাংক খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।তাদের মতে, সচেতন ও পরিকল্পিত ব্যবহার নিশ্চিত করা গেলে ক্রেডিট কার্ড শুধু একটি আর্থিক পণ্য নয়, বরং আধুনিক জীবনযাত্রার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সহায়ক মাধ্যম হয়ে উঠতে পারে।
কপিরাইট © ২০২৬ বাংলা গ্লোবাল বুলেটিন । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত