প্রিন্ট এর তারিখ : ১৯ এপ্রিল ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ৩০ মার্চ ২০২৬
ইরান যুদ্ধ, নাকি মজুত ব্যর্থতা—দেশে জ্বালানি তেলের সংকটে কার দায় কতটা?
ইব্রাহিম পাঠান, উপদেষ্টা সম্পাদক ||
বিষয়টা এমন না যে, ইরান যুদ্ধ শুরু হওয়ার পরই বাংলাদেশের জ্বালানি মজুত পরিস্থিতি সংকটজনকভাবে কমে এসেছে। বরং আপৎকালীন জ্বালানি মজুত ব্যবস্থাপনা ঐতিহাসিকভাবেই খুবই ভঙ্গুর। মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের শুরুতেই তেল নিয়ে কাড়াকাড়িতে আসল চেহারাটা সামনে এসেছে মাত্র। মূলত কোনো সময়ই গড়ে ১৫ থেকে ২০ দিনের বেশি জ্বালানি তেল মজুত রাখে না বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন-বিপিসি। অথচ ২০২৪-২০২৫ অর্থবছরের হিসাবে, বর্তমান ব্যবহারের ধারা বিবেচনায় ৪৫ দিনের চাহিদা সমপরিমাণ তেল, অর্থাৎ ১৫.৭ লাখ টন মজুত ক্ষমতা আছে বাংলাদেশের। এই যে বিদ্যমান সক্ষমতার তিনভাগের দুই ভাগ সবসময় অব্যবহৃত থেকে যায়, স্বাভাবিক বাজারেও কেন ডিপোগুলো ফাঁকা থাকে, তা নিয়ে বিপিসিকে কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে প্রশ্ন করার সুযোগ রয়ে গেছে। পৃথিবীর বড় অর্থনীতির দেশগুলো সস্তায় তেল কিনে মজুত রাখে। আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী ৯০ দিনের জ্বালানি মজুতের সক্ষমতাকে আদর্শ বিবেচনা করা হয়। কিন্তু বিপিসির মতো একটি বৃহৎ সরকারি করপোরেশনের মজুত সক্ষমতা কেন আদর্শ মাত্রার অর্ধেক—এ নিয়ে কম আলোচনা হয়নি। বিভিন্ন রাজনৈতিক সরকার মজুত বাড়ানোর উদ্যোগ শুধু প্রতিশ্রুতি এবং পরিকল্পনাতেই আটকে রেখেছেন। এখনো একই কথা শুনে যাচ্ছি। মজুত সক্ষমতা বাড়ানোর জন্য উঠেপড়ে লাগার মতো গুরুত্ব বাংলাদেশের জ্বালানি খাত কখনোই পায়নি।একসময় সরকারি ঋণ-সহযোগিতায় চলতে হলেও, বেশ কয়েক বছর ধরে বিপিসি লাভ করছে। গেল অর্থবছরেও ট্যাক্স, ভ্যাট, মুনাফা থেকে সরকারি কোষাগারে ১৩ হাজার ৭৫ কোটি টাকা জমা দিয়েছে সরকারি এই করপোরেশন। যদিও ডলার সংকটের সময়গুলোতে আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছ থেকে ঋণ করে তেল কেনার টাকা জোগাড় করেছে বিপিসি। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এসব ধারদেনা পরিশোধ করেছে বিপিসি। এছাড়াও তেল বিপণন কোম্পানিগুলোর কর্মচারীরা বছর শেষে বড় অঙ্কের টাকা বোনাস হিসেবেও পকেটে ভরেন বলে জানা যায়। এবার একটু উন্নয়নের ফিরিস্তি দিই। ঢাকায় প্রধান কার্যালয়ের জন্য ২০ তলা যমুনা অফিস বিল্ডিং, চট্টগ্রামে ১৯ তলা মেঘনা ভবন এবং পদ্মা ওয়েল কোম্পানির প্রধান ভবন নির্মাণাধীন আছে। পাইপলাইনের মাধ্যমে মহেশখালীর ডিপোতে তেল খালাস করার জন্য সাগরে বসানো হয়েছে সিঙ্গেল পয়েন্ট মুরিং (SPM), যার মাধ্যমে মাত্র ৪৮ ঘণ্টায় তেল খালাস করার সুবিধা স্থাপনের কাজ শেষ হয়েছে ২০২৪ সালের আগস্ট মাসে। কিন্তু এরপর এটি সচল হয়নি; ঠিকাদার নিয়োগ-সংক্রান্ত জটিলতায় এখনো আটকে আছে। চালু হলে মহেশখালীর ডিপোতে আড়াই লাখ টন তেল মজুতের সুযোগ থাকবে, যেখানে ৩টি ডিপোতে ৯০ হাজার টন পরিশোধিত ডিজেল রাখার সুযোগ আছে। কিন্তু এটি কবে নাগাদ হবে, তা নিয়ে অগ্রগতি নেই।বিপিসির প্রতিবেদন অনুযায়ী, আগামীতে মহেশখালীতে স্টোরেজ ট্যাংক নির্মাণের প্রস্তাব বিবেচনায় আছে। প্রাথমিক পরিকল্পনামতে, মহেশখালীর সিঙ্গেল পয়েন্ট মুরিং বা এসপিএম প্রকল্পের পাশে ১৯১ একর জমি অধিগ্রহণ করা হবে, যেখানে ৪ লাখ ৬২ হাজার টন ক্রুড অয়েল ধারণক্ষমতার ১১টি ট্যাংক এবং ৩ লাখ টন ডিজেল সংরক্ষণের জন্য ১৩টি ট্যাংক নির্মাণের পরিকল্পনা আছে। তবে এর অগ্রগতি এখনো পরামর্শক নিয়োগের প্রাথমিক পর্যায়েই রয়ে গেছে।বর্তমান চাহিদা ও সরবরাহ ব্যবস্থায় বিতরণ বা বিক্রয় করা জ্বালানি তেলের প্রায় ৬৩ শতাংশই ডিজেল। ডিজেলের প্রায় পুরোটাই যায় পরিবহন খাতে, কিছুটা সেচসহ অন্যান্য কাজে। উড়োজাহাজের জ্বালানি বা জেট ফুয়েলের চাহিদা ৮ শতাংশ। তবে সবচেয়ে বেশি হইচই হয় পেট্রোল এবং অকটেন নিয়ে। মোট ব্যবহারের ৬ শতাংশ পেট্রোল এবং প্রায় একই পরিমাণ অকটেনের অধিকাংশ ব্যবহার হয় উচ্চবিত্ত বা সমর্থবানদের ব্যক্তিগত গাড়িবহরে। পেট্রোল এবং অকটেনের একটি বড় অংশ বাংলাদেশের গ্যাস ফিল্ডগুলোতে উপজাত হিসেবে তৈরি হয়; বাকিটা আমদানি করে সরকার। তাই মোটা দাগে বললে, বাংলাদেশের জ্বালানি তেলের নিরাপত্তা বলতে মূলত ডিজেলের পর্যাপ্ত সরবরাহকেই বোঝানো যেতে পারে। পরিতাপের বিষয় হলো, অধিক ব্যবহৃত এই জ্বালানি তেলের মজুতও বড়জোর ২০ দিনের বেশি রাখার ব্যবস্থা নেই বিপিসির।বিপিসির বার্ষিক প্রতিবেদনমতে, বাংলাদেশ শুধু মধ্যপ্রাচ্যের দেশ যেমন সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে জ্বালানি তেল আমদানি করে তা-ই নয়; নিয়মিত সরবরাহকারীর তালিকায় আরও রয়েছে ভারত, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, চীন, থাইল্যান্ডের মতো দেশ।হরমুজ প্রণালী দিয়ে বৈশ্বিক জ্বালানির ২০ শতাংশ পরিবহন করা হয়। যেহেতু বাংলাদেশের মধ্যপ্রাচ্য ছাড়াও অন্যান্য উৎস থেকে জ্বালানি আমদানির প্রতিষ্ঠিত সরবরাহকারী বিদ্যমান রয়েছে, তাই আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বাড়লেও নিয়মিতভাবে তেল আমদানি করা সম্ভব। আসামের নুমালীগড় রিফাইনারি থেকে পাইপলাইনের মাধ্যমে যে পরিমাণ ডিজেল আমদানি করার সুযোগ আছে, তা দিয়ে ডিজেলের চাহিদার বড় অংশ পূরণ করা সম্ভব। কিন্তু বাড়তি আমদানির তেল মজুতের জায়গা নেই। আন্তর্জাতিক বাজারে দাম কমলেও সেই সুযোগ কাজে লাগানো যায় না। তাই জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে দরকার পর্যাপ্ত মজুতের সক্ষমতা।
কপিরাইট © ২০২৬ বাংলা গ্লোবাল বুলেটিন । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত