প্রিন্ট এর তারিখ : ২৭ অক্টোবর ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ২৯ জানুয়ারি ২০২৬
শ্রমবাজারে নারীর আর্থিক ক্ষমতায়ন জোরদার না হলে টেকসই প্রবৃদ্ধি সম্ভব নয়
অনলাইন ডেস্ক ||
শ্রমবাজারে নারীর আর্থিক ক্ষমতায়ন জোরদার করা না গেলে
বাংলাদেশের টেকসই ও অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনৈতিক
প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করা সম্ভব নয়
বলে মন্তব্য করেছেন বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদরা। তারা বলেন, সাম্প্রতিক
বছরগুলোতে শ্রমবাজারের কাঠামোগত খণ্ডিতকরণ, অনানুষ্ঠানিকতা বৃদ্ধি এবং নারীর বিনামূল্যে
গৃহস্থালী কাজের ভার বেড়ে যাওয়ায়
নারীর শ্রমশক্তি অংশগ্রহণ উদ্বেগজনকভাবে কমছে, যা জাতীয় অর্থনীতির
জন্য একটি নীতিগত সতর্ক
সংকেত। বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতি (বিইএ) এবং ইডেন মহিলা
কলেজের যৌথ উদ্যোগে গতকাল বুধবার (২৮ জানুয়ারি) সকালে রাজধানীর ইডেন মহিলা কলেজ
অডিটরিয়ামে আয়োজিত “বাংলাদেশে নারীর আর্থিক ক্ষমতায়ন: শ্রমবাজার প্রেক্ষিত” শীর্ষক সেমিনারে বক্তারা এসব কথা বলেন।
সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপনকালে
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (প্রশাসন)
ও অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. সায়মা হক
বিদিশা বলেন, গত এক দশকে
নারীর শ্রমবাজার অংশগ্রহণে অগ্রগতি হলেও সাম্প্রতিক সময়ে
সেই ধারা স্থবির হয়ে
পড়েছে। তিনি উল্লেখ করেন,
বাংলাদেশে নারীর শ্রমবাজার অংশগ্রহণ হ্রাস পাচ্ছে, বিশেষ করে শহরাঞ্চলে অবস্থা
উদ্বেগজনক। নারীরা মূলত কৃষি খাতে
অধিক মাত্রায় নিয়োজিত এবং অনানুষ্ঠানিক খাতে
তাদের অংশগ্রহণ উল্লেখযোগ্য। অন্যদিকে, ব্যবস্থাপনা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণমূলক
পদে নারীর অংশগ্রহণ কম। এছাড়াও উচ্চ
হারে নারী ‘না শিক্ষা, না
কর্ম, না প্রশিক্ষণ’ অবস্থায়
রয়েছেন এবং নারীরা বিনা
পারিশ্রমিকে গৃহস্থালি ও সেবামূলক কাজে
ব্যাপক সময় দিচ্ছেন, যা
জাতীয় হিসাবে স্বীকৃত নয়।
তিনি আরও বলেন, বিবিএস-এর ত্রৈমাসিক শ্রমশক্তি
জরিপ অনুযায়ী, ২০২৩ সালের দ্বিতীয়
প্রান্তিকে (এপ্রিল-জুন) নারীর শ্রমশক্তি
অংশগ্রহণের হার ৪৬.৫৯
শতাংশ থাকলেও ২০২৪ সালের একই
সময়ে তা কমে ৪২.৪০ শতাংশে নেমে
এসেছে। এ ছাড়া ২০২৪
সালে নারীর মোট শ্রমশক্তি ২.৫৩ কোটি থেকে
কমে ২.৩৭ কোটিতে
নেমে আসে, যা অর্থনৈতিক
প্রবৃদ্ধি ও মহামারিপরবর্তী পুনরুদ্ধারের
লক্ষ্যকে বাধাগ্রস্ত করছে। ড. বিদিশা বলেন,
শ্রমবাজারের পিতৃতান্ত্রিক কাঠামো, সামাজিক নিয়ন্ত্রণ, বিনা পারিশ্রমিকে গৃহস্থালি
ও সেবাকর্মের অতিরিক্ত চাপ, চাইল্ডকেয়ার সুবিধার
অভাব এবং কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তাহীনতা
নারীর শ্রমবাজার অংশগ্রহণের প্রধান অন্তরায়। তিনি উল্লেখ করেন,
নারীর বিপুল পরিমাণ অনানুষ্ঠানিক ও অদৃশ্য শ্রম
অর্থনীতিতে অবদান রাখলেও তা জাতীয় আয়
হিসাব ও নীতিনির্ধারণে যথাযথভাবে
প্রতিফলিত হয় না। তাঁর
মতে, গৃহস্থালি ও কেয়ার কাজকে
অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া এবং ‘ডোমেস্টিক টু
মার্কেট স্পেস’ রূপান্তরের জন্য প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা
জোরদার করা জরুরি।
সেমিনারে সভাপতির বক্তব্যে বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতির আহ্বায়ক অধ্যাপক ড. মাহবুব উল্লাহ্ বলেন, নারীর শ্রমবাজারে অংশগ্রহণ বৃদ্ধি কেবল সামাজিক ন্যায়বিচারের বিষয় নয়, বরং এটি জাতীয় অর্থনীতির উৎপাদনশীলতা ও টেকসই উন্নয়নের একটি মৌলিক শর্ত; যার অনুপস্থিতি দারিদ্র্য, আয় বৈষম্য ও সামাজিক ঝুঁকিকে আরও গভীর করে তোলে। এই লক্ষ্য অর্জনে তিনি প্রচলিত পিতৃতান্ত্রিক মনোভাব ও প্রাতিষ্ঠানিক বাধা দূর করে একটি জেন্ডার-বান্ধব শ্রমবাজার কাঠামো গড়ার ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করেন। তিনি শ্রম আইন সংস্কার, নারীবান্ধব কর্মঘণ্টা, নিরাপদ পরিবহন ব্যবস্থা এবং কর্মক্ষেত্রে যৌন হয়রানি রোধে কঠোর বিধিমালা প্রণয়নের মতো নীতিগত হস্তক্ষেপের পাশাপাশি নারী উদ্যোক্তাদের জন্য সহজ শর্তে ঋণ, বিপণন সহায়তা ও ডিজিটাল প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করার আহ্বান জানান। যথাযথ নীতি প্রণয়নে তিনি জেন্ডার-বিভক্ত তথ্য সংগ্রহের মাধ্যমে ডেটা-ভিত্তিক পরিকল্পনার ওপর জোর দেন এবং নারীর গৃহস্থালি কাজের স্বীকৃতি ও দায়িত্ব পুনর্বণ্টনের মাধ্যমে সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধির কথা বলেন। পরিশেষে তিনি উল্লেখ করেন, সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্ব এবং সমন্বিত নারীবান্ধব কর্মসংস্থান নীতির মাধ্যমেই কেবল নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন টেকসইভাবে নিশ্চিত করা সম্ভব। তিনি বলেন, আমাদের সবাইকে মনে রাখতে হবে, “ বিশ্বে যা-কিছু মহান সৃষ্টি চির-কল্যাণকর অর্ধেক তার করিয়াছে নারী, অর্ধেক তার নর।”
অনুষ্ঠানে সম্মানিত অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)-এর নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন। তিনি বলেন, নারীর আর্থিক ক্ষমতায়নে অন্যতম মূল বাধা হচ্ছে, নারীকে মূলধারার অর্থনীতিতে অন্তর্ভুক্ত না করা এবং নারীর অবদানকে ভিন্ন দৃষ্টিতে দেখা। তাঁর মতে, শ্রমবাজারে নারীর অংশগ্রহণ হ্রাস একটি কাঠামোগত সংকটের প্রতিফলন, যা সমন্বিত নীতি হস্তক্ষেপ দাবি করে। তিনি বলেন, নারীর জন্য সুযোগ থাকলেও তার সক্ষমতায় অভাব, বিশেষ করে প্রযুক্তি দক্ষতার অভাবে নারীরা কর্মক্ষেত্রে পিছিয়ে পড়ছে। তাঁর মতে, এ জন্যে বাজেটে যথাযথ বরাদ্দের মাধ্যমে শিক্ষা, দক্ষতা উন্নয়ন, সামাজিক সুরক্ষা, নিরাপদ কর্মপরিবেশ এবং সচেতনতা বৃদ্ধির মাধ্যমে নারীর শ্রমবাজার সংযুক্তি জোরদার করতে হবে।
স্বাগত বক্তব্যে বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতির সদস্য সচিব ও মাইক্রোক্রেডিট রেগুলেটরি অথরিটির (এমআরএ) এক্সিকিউটিভ ভাইস চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন বলেন, মাইক্রোক্রেডিট কর্মসূচি নারীর আর্থিক অন্তর্ভুক্তি বাড়ালেও কেবল ঋণপ্রাপ্তি যথেষ্ট নয়। তিনি বলেন, দক্ষতা উন্নয়ন, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা এবং উৎপাদনশীল ও সম্মানজনক কর্মসংস্থান সৃষ্টি না হলে নারীর আর্থিক ক্ষমতায়ন টেকসই হবে না। তিনি বলেন, নারীর শ্রমবাজার অংশগ্রহণ হ্রাস পেলে দারিদ্র্য, আয় বৈষম্য ও সামাজিক ঝুঁকি আরও গভীর হয়। এ জন্য তিনি শ্রমবাজার সংস্কার, সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্ব এবং নারীবান্ধব কর্মসংস্থান নীতির ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
সেমিনারে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজের গবেষণা পরিচালক ড. কাজী ইকবাল বলেন, সামাজিক অনুশাসন পরিবর্তন, গণমাধ্যমের মাধ্যমে সচেতনতা বৃদ্ধি এবং সহায়ক নীতিমালার মাধ্যমে নারীর শ্রমবাজার অংশগ্রহণ উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানো সম্ভব, যা দারিদ্র্য হ্রাস ও পারিবারিক আয়ের উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। তিনি তথ্য-পরিসংখ্যানের নির্ভুলতা ও গ্রহণযোগ্যতা নিশ্চিতে গবেষক ও অর্থনীতিবিদদের পারস্পরিক আলাপ-আলোচনার ওপর গুরুত্ব দেওয়ার জন্য সবার প্রতি আহ্বান জানান।
যৌথ এই জাতীয় সেমিনারে ইডেন মহিলা কলেজের শিক্ষক-শিক্ষার্থী, বিভিন্ন পেশাজীবী সংগঠনের প্রতিনিধি এবং বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতির সদস্যবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন। বক্তারা আশা প্রকাশ করেন, সেমিনারে উত্থাপিত গবেষণালব্ধ বিশ্লেষণ ও নীতিগত সুপারিশসমূহ ভবিষ্যৎ নীতিনির্ধারণে কার্যকর অবদান রাখবে।
কপিরাইট © ২০২৬ বাংলা গ্লোবাল বুলেটিন । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত